অটোপাস মর্যাদাহীন এবং রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর

125
নজরুল ইসলাম ভুঁইয়া

নজরুল ইসলাম ভুঁইয়া

গতবছর ৮ মার্চ, ২০২০ তারিখে বাংলাদেশে প্রথম প্রাণঘাতী মহামারি করোনা ভাইরাস ধরা পড়ে। এরপর ১৮ মার্চ থেকে হঠাৎ করে পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই সারাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। দীর্ঘ দশমাস ধরে বন্ধ আছে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও শিক্ষার্থীদের পাঠদান নিশ্চিত করতে সংসদ টেলিভিশন এবং অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে নেয়া হয়েছে। যদিও এই পদ্ধতিতে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়নি। স্কুল জীবনের এই বাধভাঙা উচ্ছ্বাস আবার কবে দেখা যাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। মরণব্যাধি করোনার দাপটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন নিরবতা ও শূন্যতা বিরাজমান। দেশে এখন করোনার দ্বিতীয় ঢেউ চলছে। করোনা মহামারি ব্যাপক আকারে ছড়াতে পারে এই ভয়ে সরকার শিক্ষার্থীদের থেকে পরীক্ষা না নিয়ে অটোপাসের মাধ্যমে উপরের শেণিতে উত্তীর্ণ ঘোষণা করেছে। তাই বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে আলোচিত শব্দ অটোপাস। এই অটোপাসের পক্ষে-বিপক্ষে অনেক বিশেষজ্ঞ মতামত দিয়েছেন। অটোপাস শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিজীবনে নয় বরং রাষ্ট্রের জন্যও বড় ক্ষতিকর। অটোপাসে কোনো মর্যাদা নেই। অটোপাসকে মানুষ করোনাকালের করুণা পাস বলছে। এটা জাতির জন্য, শিক্ষাব্যবস্থার জন্য, অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীদের জন্য অপমানজনক। পরীক্ষার বিকল্প পরীক্ষা-অটোপাস নয়। আমাদেরকে এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে হবে। গড় অংক করতে সহজ , তাই বলে শিক্ষার্থীদের পূর্ববর্তী দুই পরীক্ষার ফলাফলের গড় দিয়ে তাদের মেধা যাচাই করা বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়। অফিস, কলকারখানা, গার্মেন্টস, গণপরিবহনসহ সবকিছুই চালু আছে। তাহলে পরীক্ষা নেয়া হয় নি কেন? আমাদের অনেক স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় এবং কমিউনিটি সেন্টার আছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে অন্ততপক্ষে পাবলিক পরীক্ষাগুলো নেয়া যেত। কিন্তু সরকার তা না করে অটোপাস ঘোষণা করলো? স্বদিচ্ছা থাকলে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে পরীক্ষা কেন্দ্র ঘোষণা করে অতিরিক্তি জনবল নিয়োগ করে পাবলিক পরীক্ষাগুলো নেয়া যেত। বাস, লঞ্চ, রেলস্টেশন, পার্ক সব জায়গায় গিজগিজ করছে মানুষ। সংসদের উপনির্বাচন থেকে স্থানীয় পর্যায়ের সব নির্বাচনই নির্বিঘ্নে হচ্ছে। দিনরাত চলছে নির্বাচনী সভা-সমাবেশ এবং মহড়া। হয়নি শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যে দেশে করোনাকালীন নির্বাচন হয় সে দেশে গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষাগুলো হতে পারবে না কেন? পরীক্ষা নেয়ার ইচ্ছা থাকলে উপায় বের হতোই। দীর্ঘ সময় নিয়ে কেন্দ্র এবং লোকবল বাড়িয়ে পরীক্ষা নেয়া যেত। কারণ পরীক্ষা ছাড়া অর্জিত বিদ্যার মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষা হচ্ছে এইচএসসি পরীক্ষা। তাই স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা বা পিএসসি-জেএসসি পরীক্ষার সঙ্গে এইচএসসি পরীক্ষাকে একই দৃষ্টিতে দেখা মারাত্মক ভুল। অটোপাসে শিক্ষার্থীরা খুশি হলেও পরবর্তী জীবনে পদে পদে তাদেরকে হেনস্তার শিকার হতে হবে। বর্তমানে আমাদের দেশ অনেকক্ষেত্রে উন্নত হয়েছে। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করেও পরীক্ষা নেয়া যেত। আর যদি জেএসসি-এসএসসি পরীক্ষার গড় ফলাফল নিয়ে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের মুল্যায়ন করা হয়, তাহলে তা গত বছরের এপ্রিল-মে-জুন মাসে করাই যেত। অযথা সময়ক্ষেপন করে শিক্ষার্থীদের এক বছর নষ্ট করা হলো কেন? বর্তমান বাস্তবতায় পত্র-পত্রিকা পড়ে উন্নত বিশ্বের কোনো দেশে অটোপাস দেওয়ার কোনো খবর পাইনি। অটোপাস ভালো সমাধান নয়। কারণ কোনো শিক্ষার্থীর মেধার মুল্যায়র করার জন্য পরীক্ষার বিকল্প হতে পারে শুধুই পরীক্ষা, অন্য কিছু নয়। অটোপাসের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে এবং তাদের অটোপাসের গ্লানি সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে। করোনার বাস্তবতা মেনে নিয়ে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে করোনাকালীন দীর্ঘসময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে অনেক শিক্ষার্থী পড়ালেখা ছেড়ে কর্মমুখী হচ্ছে এবং বাল্যবিবাহ অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই এ সবকিছু বিবেচনা করে অতিসত্ত্বর স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রশান্তি দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান করছি। পরিশেষে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রত্যাশীসহ সকল শিক্ষার্থীদের প্রতি ভবিষ্যতের জন্য শুভকামনা জানিয়ে বলছি, ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি যেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’

নজরুল ইসলাম ভুঁইয়া
সাবেক শিক্ষার্থী
রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

print