আজারবাইজান আর্মেনিয়া যুদ্ধ কোন পথে বিশ্ব?

101
নজরুল ইসলাম ভুঁইয়া

নজরুল ইসলাম ভুঁইয়া

আজারবাইজান-আর্মেনিয়ার মধ্যে তীব্র যুদ্ধ চলছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ফ্রান্স এবং ইরানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আলাপ আলোচনার মাধ্যমে নাগোর্নো-কারাবাখ সঙ্কটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহবান জানিয়েছে। সাতাশে সেপ্টেম্বর রোববার সকালে হঠাৎ যুদ্ধ আরম্ভ হয়ে যাওয়ার পর সবাই অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহবান জানালেও একমাত্র দেশ তুরস্ক আজারবাইজানের পক্ষে নৈতিক-সামরিক সহযোগিতার ঘোষণা দিয়েছে। নাগোর্নো-কারাবাখ নিয়ে আজারবাইজান-আর্মেনিয়ার মধ্যে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বিরোধ চলছে। এই বিরোধ মেটাতে মিনস্ক গ্রুপ নামে মধ্যস্থতাকারী দল কয়েক বছর ধরে আলোচনা করছে যাতে নেতৃত্ব দিচ্ছে রাশিয়া, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে নিরাপত্তা ও সহযোগিতা বিষয়ক সংস্থা ওএসসিই। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর আর্মেনিয়ার সেনাবাহিনী নাগোর্নো-কারাবাখ দখল করে নিয়েছিল। আন্তর্জাতিকভাবে এটি আজারবাইজানের বলে স্বীকৃত, কিন্তু এটি পরিচালনা করে জাতিগত আর্মেনীয়রা। এর মধ্যে নাগোর্নো-কারাবাখ নিজেদের স্বাধীন প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করে সরকারও গঠন করেছে। কিন্তু আজারবাইজান-আর্মেনিয়া কেউই তা মেনে নেয় নি। এলাকাটি তারা নিজেদের অংশ বলে মনে করে। আজারবাইজানের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। ১৯১৮ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে আজারবাইজানকে সমর্থন দিয়ে আসছে তুরস্ক। দুটো দেশ নিজেদের এক জাতি, দুই দেশ নীতিতে বিশ্বাসী। তুর্কী-আজেরিরা বিশ্বাস করে তাদের উৎস এক এবং তারা একই রক্ত, ইতিহাস ও সংস্কৃতির উত্তরসূরি। আর্মেনিয়া-আজারবাইজানের সাথে রাশিয়ার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক রয়েছে। দুটো দেশের কাছেই তারা অস্ত্র বিক্রি করে। মস্কো আর্মেনিয়াকে নিরাপত্তা সহযোগিতা প্রদান করে থাকে। কিন্তÍু এলাকাটি আন্তর্জাতিকভাবে আজারবাইজানের অংশ হিসেবে স্বীকৃত বলে মস্কো আর্মেনিয়াকে সহযোগিতা করবে না আবার আজারবাইজানের সঙ্গেও রাশিয়ার সম্পর্ক ভালো। আর্মেনিয়া-আজারবাইজান দুটি দেশের সঙ্গেই ইরানের সীমান্ত রয়েছে। ইরান বলছে বিভিন্ন দেশের নানাগোষ্ঠী এই যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। ফলে যেকোনো সময় একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ লেগে যেতে পারে এবং তা ঘটলে গোটা অঞ্চলের শান্তি বিঘ্নিত হবে। ফলে দ্রুত সমাধানের রাস্তা খুঁজে বের করা দরকার। ইরানের পরে আজারবাইজানই দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া মতাদর্শে বিশ্বাসী দেশ। তবে বৃহত্তর আজারবাইজান তথা স্বাধীন আজারবাইজান রাষ্ট্র এবং ইরানের উত্তরাঞ্চলের আজেরি-তুর্কী জনগোষ্ঠী আধ্যুসিত ইরানী-আজারবাইজান অঞ্চল নিয়ে, অভ্যন্তরীন রাজনীতি ও ইসরায়েল-তুরস্ক ইস্যুতে ইরান-আজারবাইজান দ্বন্দ্ব। একারনেই ১৯৯২ সালে শুরু হ্ওয়া আর্মেনীয় দখলদারি হামলার সময় ইরান আর্মেনিয়ার পক্ষ নিয়েছিল। সিরিয়া, ফিলিস্তিন, ইরাক, লেবানন, লিবিয়াতে তুরস্ক তেহরানকে যে চাপে রেখেছে তাতে ইরান চাইবে না তুরস্ক শক্তিশালী হোক। ইরান এবং ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যসহ সব ক্ষেত্রেই অবস্থান করেছে পরস্পর বিরোধী মেরুতে। আজারবাইজান-ইসরাইল সখ্যতা ইরানের সহ্য হয় না। আজারবাইজান ইসরাইলের কাছ থেকে অস্ত্র কিনে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করছে ফলে ইরান আজারবাইজানের বিরদ্ধে। ইসরায়েল ইরানের প্রতিবেশী আজারবাইজানের সঙ্গে সখ্যতা করে এ অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি করে ইরানকে ব্যস্ত রাখতে চায়। নাগর্নো-কারাবাখের যুদ্ধ যদি আরও বিস্তৃত হয়, তা হলে ইরানের সীমান্তও সুরক্ষিত থাকবে না সেজন্য ইরান এই যুদ্ধ থামাবার কথা বলছে। তবে এবার ইরান আজারবাইজানের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে দুটি পক্ষকে সমস্যা সমাধানের আহবান জানান। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোগানকে আর্মেনিয়া-আজারবাইজান যুদ্ধের প্রধান উসকানিদাতা হিসেবে অভিহিত করেছেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ। সিরিয়ার সরকার স্বীকার করেছে, যুদ্ধে সিরিয়ার যোদ্ধারা অংশ নিয়েছে। আরো কয়েকটি জঙ্গিগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের কথাও শোনা যাচ্ছে। তুরস্কের সরাসরি যোগদান নিয়ে সরব রয়েছে আর্মেনিয়া। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত নাগর্নো-কারাবাখ নিয়ে দুদেশের মধ্যে যুদ্ধে ৩০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এবারের সংঘর্ষের ঘটনাটি ওই বিরোধপূর্ণ অঞ্চল থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার উত্তরে আর্মেনিয়ার তাভুশ অঞ্চলে ঘটেছে। ইরান, জর্জিয়া এবং কাতার এতে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছে। আজারবাইজান খুব দ্রুত কিছু এলাকা পুনর্দখল করে নিয়ে সামরিক সাফল্য অর্জন করেছে। এই যুদ্ধ বেশি সময় গড়ালে এবং একটি পক্ষের পরাজয় ঘটতে থাকলে রাশিয়া-তুরস্কের পক্ষে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হবে। রাশিয়া যদি ঘোষণা করে যুদ্ধ না থামালে আর্মেনিয়া-আজারবাইজানে তারা অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করে দেবে তাহলে যুদ্ধ বন্ধ করা অনেক বেশি সহজ হবে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জার্মানি, ফ্রান্স, ভ্যাটিক্যান, জাতিসংঘ এবং ওআইসি দুই দেশকেই সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা কমিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছে। পাকিস্তান আজারবাইজানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলছে, আর্মেনিয়ান সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিন্দনীয় এবং অশুভ। রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট আর্মেনিয়ান প্রধানমন্ত্রী নিকোলে পেশিনিয়ানের সাথে কথা বলে বড় ধরনের হামলা এড়ানোর জন্য সম্ভবপর সময়ে আলোচনায় বসে যুদ্ধের পরিসমাপ্তির পরামর্শ দিয়েছে। মস্কোয় দশ ঘন্টা আলোচনার পর আর্মেনিয়া-আজারবাইজানের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতির বিষয়ে একটা সমঝোতা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু দুটি দেশই যুদ্ধ বিরতি লঙ্ঘন করে হামলা অব্যাহত রাখছে । সর্বশেষ সংবাদ মতে এই যুদ্ধে কোনো পক্ষের গোলাবারুদ ইরানের সীমানায় পরলে সরাসরি একশনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। ইরান সরাসরি একশনে গেলেই বৃহৎ আকারে যুদ্ধের ডামাডোল বেজে উঠবে এবং পরাশক্তিগুলো যুদ্ধে জড়িয়ে যাবে।

নজরুল ইসলাম ভুঁইয়া
সাবেক শিক্ষার্থী
রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

print