চীন-ভারত সংঘাত ও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব

200
নজরুল ইসলাম ভুঁইয়া

নজরুল ইসলাম ভুঁইয়া

বিশ্ব এখনো করোনা মহামারির কাছে কাবু হয়ে আছে। প্রায় সাত মাস ধরে জনজীবন স্থবির হয়ে আছে। স্থবির হয়ে আছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বাঘা বাঘা পরাশক্তিগুলো করোনা ভাইরাসের কাছে পর্যুদস্ত । করোনা মহামারির প্রকোপে বিশ্বব্যাপি প্রায় কয়েককোটি মানুষ চাকরিহারা হচ্ছে। অন্যদিকে উপমহাদেশেও করোনার প্রকোপে দেশগুলোর স্বাস্থ্য আর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দৈন্যদশার চেহারা ফুটে উঠেছে। ভারত আক্রান্ত দেশের মধ্যে চতুর্থ স্থানে রয়েছে। এই মহা সংকটে সীমান্ত নিয়ে প্রতিবেশীদের সাথে ভারতের সম্পর্ক এখন তলানিতে।
পুরনো শত্রু চীন, চিরবৈরী পাকিস্তান। ভারতের মাথাব্যথার জন্য এই দু’টি দেশই যথেষ্ট । এর মধ্যেই সম্প্রতি মানচিত্র নিয়ে গোলমাল শুরু করেছে আরেক প্রতিবেশী নেপাল। এখন তার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করল ভুটানও। সাথে আছে বাংলাদেশের জনগণের ক্ষোভ। ফলে সবকিছু মিলিয়ে আঞ্চলিকভাবে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছে ভারত।
চীন ও ভারতের মধ্যে গত ৫ মে নতুন করে সৃষ্টি হওয়া উত্তেজনা ১৫ জুন ২০ ভারতীয় সেনার প্রাণহানির মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন আলোচনা সৃষ্টি করেছে। সেখানে সীমান্ত দ্বন্দ্বের পেছনে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মাখামাখির বিষয়টিকে কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সর্বোপরি ভারতের সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল এবং কাশ্মীর আর লাদাখ অঞ্চলকে আলাদা করে ইউনিয়ন টেরিটরি ঘোষণাও চীনকে ক্ষুব্ধ করেছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ইসরায়েল ও পশ্চিমা বিশ্বের দিকে ভারত যেভাবে ঝুঁঁকে পড়ছে, তাতে চীন ভারতকে চীনবিরোধী জোটের অগ্রসৈনিক ভাবছে। ভারত এরই মধ্যে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিপাইনের সঙ্গে সম্মিলিত নৌমহড়ায় অংশ নেয়, যা অনুষ্ঠিত হয়েছে বিরোধপূর্ণ দক্ষিণ চীন সাগরে। তদুপরি ভারত-যুক্তরাষ্ট্র কয়েক বছর ধরে ভারতীয় উত্তরাঞ্চলের বিমানঘাঁটিতে যৌথ মহড়াও করেছে। সর্বশেষ ভারত অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে মিউচুয়াল লজিস্টিক সাপোর্ট অ্যাগ্রিমেন্ট করেছে। এর আওতায় দুই দেশ তাদের নৌঘাঁটি বিভিন্ন সামরিক কারণে ব্যবহার করতে পারবে। অস্ট্রেলিয়াও চীনবিরোধী ক্যাম্পে রয়েছে। লাদাখে ভারত ও চীনা সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষে ২০ ভারতীয় সেনা নিহত ও ১০ সেনা আটকের পর বেশ মুশকিলেই পড়ে গেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি লাদাখে সংঘর্ষের ঘটনা নিয়ে সর্বদলীয় বৈঠক করেছেন। তবে নিজেদের ঘাড়ে কোনো দোষ নেয়নি চীন। এক বিবৃতিতে সব দোষ ভারতের ঘাড়ে চাপিয়ে নয়াদিল্লির চীনা দূতাবাসের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ভারতীয় সেনারা ৬ জুনের চুক্তি লঙ্ঘন করেছিল এবং সহিংসভাবে চীনা সেনাদের ওপর আক্রমণ করেছিল। যখন গালওয়ান উপত্যকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল তখন তারাই ইচ্ছাকৃত উসকানির জন্য আবার এলএসি পার হয়ে গেল এবং আলোচনার জন্য সেখানে যাওয়া চীনা কর্মকর্তা ও সৈন্যদের ওপর সহিংস আক্রমণ চালিয়েছিল। এভাবে মারাত্মক শারীরিক সংঘর্ষ ও হতাহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। উত্তেজনা বাড়তে থাকায় ভারতের বিমানবাহিনী ঘোষণা করেছে, তারা যেকোনো পরিস্থিতির জন্য তৈরি। লাদাখ সীমান্তে বিমানবাহিনী মোতায়েন করা আছে। চীনের দিকে মুখ করে যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার মোতায়েন করেছে তারা। ভারত-চীন সীমান্তে এমন হতাহত হওয়ার ঘটনা গত ৫০ বছরে ঘটেনি। চীনের পক্ষ থেকে এ ঘটনার জন্য ভারতীয় সেনাদের বিশৃঙ্খলা ও অসামরিক আচরণকে দায়ী করে ভবিষ্যতে এলাকায় উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টার কথা বলেছে। একই সঙ্গে চীন দাবি করেছে, যে অঞ্চলে এ ঘটনা ঘটেছে, সেই গালওয়ান উপত্যকা চীনের নিয়ন্ত্রিত আকসাই চীনের অন্তর্ভুক্ত। চীন ওই অঞ্চলে সেনার সংখ্যা বাড়িয়েছে এবং প্রচলিত সমরাস্ত্রও জড়ো করেছে বলে ভারতীয় সূত্রগুলো বলছে। ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং লাদাখের পরিস্থিতি নিয়ে সিডিএস জেনারেল বিপিন রাওয়াত এবং তিনজন বাহিনী প্রধানের সঙ্গে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন। এর মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমে চীনের প্রতি হুঙ্কার ছাড়লেও পরবর্তীতে দুই দেশের সাথে এ বিষয়ে আলোচনা করতে চেয়েছেন। পৃথিবীর দুটি সবচেয়ে বড় সেনাবাহিনী সীমান্তের একাধিক জায়গায় বিভিন্ন সময়ে মুখোমুখি সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে। ভারতের অভিযোগ চীন লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় হাজার হাজার সৈন্য পাঠিয়েছে এবং তাদের অভিযোগ চীন সেখানে ভারতের ৩৮ হাজার বর্গ কিলোমিটার (১৪,৭০০ বর্গ মাইল) এলাকা দখল করে রেখেছে। এই সীমান্ত নিয়ে দুদেশের মধ্যে গত তিন দশক ধরে চলা বিরোধের বহু দফা আলোচনার পর এখনও সমাধান হয়নি। তবে সীমান্ত বিরোধ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে ১৯৬২ সালে যুদ্ধ হয়েছে। যে যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয় মেনে নিতে হয় ভারতকে। উত্তর পূর্বে সিকিম রাজ্যের সীমান্তে মে মাসে ভারতীয় ও চীনা সৈন্যদের মধ্যে শারীরিক সংঘর্ষ হয়েছে। এর আগে ২০১৭ সালে ডোকলামে সীমান্তবর্তী সড়ক নিয়ে বিরোধে দুই দেশের মধ্যে সংঘাত হয়েছে। ভারত লাদাখে এলএসি বরাবর এই প্রত্যন্ত ও স্পর্শকাতর এলাকায় যে সড়ক নির্মাণ করেছে বিশেষজ্ঞরা বলছে সেটাই উত্তেজনায় নতুন করে ইন্ধন জুগিয়েছে।
ভারত ও নেপালের বর্তমান বিতর্ক হচ্ছে কালাপানি, লিপুলেখ এবং লিম্পিয়াধুরা নিয়ে। কালাপানি আর লিপুলেখকে নেপাল তার নতুন মানচিত্রে দেখানোর পর থেকেই দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ক শীতল হয়। নেপালের উত্তর-পশ্চিম অংশে এগুলো অবস্থিত- যার দক্ষিণে ভারতের কুমায়ুুন এবং উত্তরে চীনের তিব্বত। এই ভূখণ্ডটি ভারত, নেপাল ও চীন তিন দেশের একটি সংযোগস্থল। নতুন মানচিত্র প্রকাশের সিদ্ধান্ত কেপে ওলি সরকার সংসদে সর্বসম্মতভাবে পাস করিয়ে নিয়েছেন। ভারতপন্থী হিসেবে পরিচিত দলটির সাংসদরা সংসদে হাজির ছিলেন। তারা কেউ বিপক্ষে ভোট দেননি। গত ১৩ জুন নেপালি প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির নেতৃত্বাধীন পার্লামেন্টে ২৭৫টি ভোটের মধ্যে ২৫৮ ভোট পেয়ে পাস হয় নেপালের মানচিত্র পরিবর্তনের বিল। নেপালের অর্থমন্ত্রী ইউভরাজ খাটিওয়াদা এর আগে বলেছিলেন, নতুন এই মানচিত্র স্কুল-কলেজের বইপত্রে, সরকারি প্রতীকে এবং অফিস-আদালতের সব কাগজপত্রে এখন থেকেই ব্যবহার করা হবে। বিবিসি’র নেপালী সার্ভিস তথ্য দিয়েছিল, ভারতের সাম্প্রতিক তিনটি পদক্ষেপ নেপালকে ওই সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করে। গত বছর ভারত নতুন একটি রাজনৈতিক মানচিত্র প্রকাশ করেছিল। যেখানে এই বিতর্কিত ভূমি দু’টি তাদেরই ভূখন্ড হিসেবে দেখানো হয়। এরপর করোনাকালে গত ৮ মার্চ ভারতীয় রাজ্য উত্তরাখণ্ডের পিথাউরাগড়-লিপুলেখের মধ্যে একটি লিংক রোডের উদ্বোধন করেন ভারতের কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। যখন রাজনাথ সিং ওই সড়কের উদ্বোধন করেন, তখন নেপাল কাঠমন্ডুতে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছিল। শুধু তাই নয়, সীমান্তে তারা একইসঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করে, ইতিহাসে যা নজিরবিহীন। এটা ছিল নেপালের তরফে বড় কূটনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপ। তারা তাদের আপত্তির বিষয়টি উল্লেখ করে একটি কুটনৈতিক নোটও দিয়েছিল। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতিতে বলেছে, তারা নিজেদের ভূখণ্ডেই সড়কটি নির্মাণ করছে। এই ঘটনার কদিন বাদেই ওই অঞ্চলে গিয়ে ভারতের চীফ অব আর্মি স্টাফ মনোজ নারাভানে চীনকে আক্রমণ করেন। বহু বছর ধরে এসব ইস্যুতে আলোচনা করে যাচ্ছে নেপাল এবং ভারত। প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনায় দেশ দুটো সম্মত হয়েছে যে সীমান্তের এসব সমস্যা সচিবদের বৈঠকে সমাধান করা হবে। যদিও সে রকম কোন বৈঠক এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়নি। ১৮১৬ সালের ৪ মার্চ নেপাল ও ভারতের মধ্যকার সীমানা নির্ধারিত হয় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও নেপালের রাজার মধ্যে স্বাক্ষরিত সুগাউলি চুক্তির মাধ্যমে। এই দুই দেশের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৮শ’ কিলোমিটার মুক্ত সীমান্ত রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৬শ’ কিলোমিটার সীমানা জুড়েই নদী। নেপাল মনে করে ১৯৬২ সালে ভারত-চীন যুদ্ধে তারা ভারতকে ছাড় দিয়েছিল। এখন তারা তার মাশুল দিচ্ছে। কারণ ভারত চীনের কাছে পরাজিত হওয়ার পর থেকে নেপালের সীমান্তবর্তী ভূখণ্ডে সেনাচৌকি বসানো শুরু করে। তারা নেপালের কালাপানিতে সেনাশিবির তৈরি করে। এরপর আর সেনা প্রত্যাহার করেনি। বরং সেনাচৌকির সংখ্যা ক্রমেই বাড়িয়েছে। তবে ভারত বরাবরই এ দাবি অগ্রাহ্য করে আসছে। ২০১৬ সালের এক চুক্তির পর নেপাল চীনের সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করছে। এতে তাদের ভারত নির্ভরশীলতা অনেকাংশেই কমেছে। ২০১৯ সালের নভেম্বরে দ্বিখণ্ডিত জম্মু-কাশ্মীরের যে ম্যাপ ভারত প্রকাশ করে, তাতে কালাপানির অন্তর্ভুক্তি এবং ২০১৫ সালে ভারতের অবরোধ নেপালিদেরকে ভারত বিরোধী করে তুলে। এদিকে তিব্বত-নেপাল সীমান্ত সংলগ্ন ১০টি এলাকার ৩৩ হেক্টর কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে চীনের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অন্যদিকে নেপাল মানচিত্র বিরোধের পর বিহার দিল্লিতে নালিশ জানিয়েছে, নদী শাসন কাজে তারা নেপালীদের দ্বারা বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। নেপাল-ভারত সীমান্তে গণ্ডক নদীর ওপর যে বাঁধ রয়েছে, তার রক্ষণাবেক্ষণের কাজে নেপাল বারবার বাধা দেওয়ার পর বিহার সরকার এ ব্যাপারে দিল্লির জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছে। নেপালি মিডিয়া বলছে, তারা ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বাণিজ্যে বাঁধা পাচ্ছে। চীন ও পাকিস্তানের মতোই অনেকটা কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে ভারত-নেপাল সম্পর্ক।
ঠিক এই মুহূর্তে আরেক প্রতিবেশী ভুটানও নীরবে আসাম রাজ্যের বাকসা জেলা দিয়ে প্রবাহিত চ্যানেলের মাধ্যমে ভারতীয় কৃষকদের দেওয়া পানির প্রবাহ বন্ধ করে দিয়েছে। কৃত্রিমভাবে তৈরি সেচ চ্যানেলটির ওপর নির্ভরশীল বাকসা জেলার অন্তত ২৬টি গ্রামের কৃষক। ১৯৫৩ সাল থেকে এই চ্যানেলটি দিয়ে ভুটান থেকে প্রবাহিত হয়ে আসা পানির মাধ্যমে চাষাবাদের কাজ করেন তারা। ফলে হঠাৎ তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাদের অভিযোগ ভুটান সরকার তাদের অভিন্ন নদীগুলোর সেচের জল ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাঁধা দিচ্ছে, যে ধরনের ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। কোনও কারণ না উল্লেখ করে হঠাৎ করে ভুটান সরকার চ্যানেলটির পানির প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়ায় পুরো বাকসা জেলায় মারাত্মক আকারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ভুটানের এমন সিদ্ধান্তের কারণে ভুক্তভোগী কৃষক এবং আসামের নাগরিক সমাজের সদস্যরাও বিক্ষোভ মিছিল করেন। ‘কালীপুর-বোগাজুলি-কালানদী আঞ্চলিক ডং বাঁধ সমিতি’র ব্যানারে জেলার কয়েকশ কৃষক ওই বিক্ষোভে অংশ নেন। বিগত সাত দশক ধরে ভুটান থেকে ছাড়া এই পানির ওপর মারাত্মকভাবে নির্ভরশীল এসব গ্রামের কৃষকরা ভুটান সরকারকে প্রয়োজনীয় পানি ছাড়ার দাবি জানান। ভুটান থেকে বেকি, পাগলাদিয়া, পুথিমারির মতো যে সব নদী ভারতে নেমে এসেছে, বাকসা জেলার কৃষকরা সেচের জন্য সেগুলোর অসংখ্য ছোট ছোট শাখানদী বা পাহাড়ি ঝোরার ওপরেই নির্ভরশীল। এবারের চাষের মৌসুমে সে পানি না পেয়ে তারা গভীর সঙ্কটে পড়েছে।
ভারত-পাকিস্তান ঐতিহাসিকভাবে শত্রুতার সম্পর্ক। ভারতীয় পার্লামেন্টের রাজ্যসভায় ৩৭০ ধারা বাতিলের প্রস্তাব ও রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের স্বাক্ষরের পর পাকিস্তান তা প্রত্যাখ্যান করে। ৩৭০ ধারা বাতিলের তীব্র নিন্দা জানিয়ে পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, কাশ্মীর একটি বিরোধপূর্ণ এলাকা। যা আন্তর্জাতিকভাবে একটি স্বীকৃত বিষয়। কাশ্মীর বিষয়ে ভারতের একতরফা সিদ্ধান্ত ওই রাজ্যটির বিশেষ মর্যাদা বাতিল করতে পারে না। কাশ্মীরি জনগণ ভারতের এমন সিদ্ধান্ত মেনে নেবে না। ভারতের একতরফা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যে কোনো ধরনের লড়াইয়ে কাশ্মীরি জনগণকে রাজনৈতিক, কূটনৈতিকসহ সর্বপ্রকারের সহায়তা দেয়ারও ঘোষণা দিয়েছে মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পরমাণু শক্তিধর দেশ পাকিস্তান। কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক হ্রাস ও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ক স্থগিত করেছে পাকিস্তান। নয়াদিল্লি থেকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতকে ফিরিয়ে নেয়া এবং ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কারও করা হয়েছিল।
ভারতের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের আরেকটি কারণ ঘটিয়েছে শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট পদে ‘চীনপন্থী’ হিসেবে পরিচিত নেতা গোতাবায়া রাজাপাকসের বিজয়। বিপুল পরিমাণ ঋণ নেয়ার পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক সম্পর্কে ইতিমধ্যেই চীনের সঙ্গে সর্বতোভাবে জড়িয়ে পড়েছে শ্রীলংকা। দেশটি তার হাম্বানটোনা সুমুদ্র বন্দর চীনের হাতে তুলে দেয়ায় ভারতের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকির সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের আশংকা, নতুন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে চীনকে শ্রীলংকায় ভারতবিরোধী ঘাঁটি তৈরি করতে দেবেন যে জন্য চীন বহু বছর ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ বারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভারতের প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল সাজিথ প্রেমাদাসার দিকেই। গোতাবায় শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় বেশ অস্বস্তিতে আছে ভারত। কারণ এই বিজয়ের মধ্যদিয়ে দেশটিতে চীনের প্রভাব আরো বেড়ে যাবে। চীন ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে বরাবর সেতু হিসাবে কাজ করেছে রাজাপাকসের পরিবার। গোতাবায়ার সরকারে ভারতের তুলনায় চিন যে বেশি গুরুত্ব পাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। নির্বাচনী প্রচারনার সময় রাজাপাকসে স্পষ্ট করে বলেছেন বিজয়ী হলে তিনি চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করবেন। চীনের কাছে শ্রীলংকা ঋণ নিয়ে আগের সরকারের সাথে বেশ টানাপড়েন ছিলো। শ্রীলংকার রাজনীতিতে যা স্পর্শকাতর বিষয়। ভূরাজনৈতিক ভাবে শ্রীলংকা এখন চীনের অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ। চীনারা দেশটিতে আধুনিক বন্দর, রেলপথ আর মহাসড়ক তৈরি করে দিয়েছে। শ্রীলংকার হাম্বানতাতো বন্দর চীনের নিয়ন্ত্রনে। মাহিন্দ্র রাজাপাকসের সময় এই বন্দর নির্মান করা হয়েছিলো। এর মাধ্যমে ভারত মহাসাগরে ঢোকার সুযোগ পেয়েছে চীন। চীনের মেরিটাইম সিল্করোডের গুরুত্বপূর্ন কেন্দ্র শ্রীলংকা। সমুদ্র সীমায় চীনের প্রভাব বিস্তারে কলোম্বো বেইজিংয়ের পাশে দাড়াবে। এছাড়া শ্রীলংকার আভ্যন্তরিন রাজনীতিতে ভারতের বিভিন্ন সময় হস্তক্ষেপের কারনে দেশটির অনেক মানুষ ভারতের ওপর বিরক্ত। তারা মনে করেন ভারত বিগ ব্রাদারসুলভ আচরন করছে। গোতাবায়ার বিজয়ের পেছনে এটিও একটি ফ্যাক্টর হিসাবে কাজ করে। কারন শ্রীলংকার মানুষ মনে করেন ভারতের বিরুদ্ধে শক্ত ভাবে দাঁড়াতে পারবে গোতাবায়া।
বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের মাঝে বিষফোঁড়া হলো সীমান্ত হত্যা, যা নিয়ে প্রায়ই উত্তপ্ত হয়ে উঠে বাংলাদেশের জনগণ। নিরাপত্তা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় যা খুব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। কেননা বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৪,০৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে, যা পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম স্থল সীমান্ত। ২০২০ সালের প্রথম মাসেই ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে ১২জন বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে। ভারতের পক্ষে সীমান্ত হত্যা বন্ধের প্রতিশ্রুতি থাকলেও সেটি বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। সীমান্ত হত্যা নিয়ে দুদেশের সরকারি পর্যায়ে শীর্ষ বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা এবং বিজিবি বিএসএফ সম্মেলনে বার বার আলোচনা হলেও সীমান্ত হত্যা বন্ধ হচ্ছে না। ভারতীয়দের পক্ষে সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার এবং মৃত্যু বন্ধে প্রতিশ্রুতি রয়েছে। ভারত সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকেও অঙ্গীকার করা হয়েছিল যে সীমান্ত হত্যা শূণ্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হবে। কিন্তু আমরা প্রতিবারই দেখছি এ জায়গাটাতে প্রতিশ্রুতির সাথে বাস্তবায়নের মিল নেই। বিজিবি কিংবা সরকারি পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতিবাদ, উদ্বেগ বা অনুরোধ যে খুব কাজে আসছে না, সেটি অনেকটা স্পষ্ট। এদিকে গত পাঁচ বছরের মধ্যে ২০১৮ সালে সীমান্ত হত্যা কিছুটা কমলেও সেটি তিনগুন বেড়েছে ২০১৯ সালে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসেবে ২০১৮ সালে সীমান্তে নিহতের সংখ্যা ১৪ জন, যেটি ২০১৯ সালে বেড়ে হয়েছে ৪৩ জনে। সংস্থাটির আরেক পরিসংখ্যানে দেখা যায় ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে সীমান্তে ১৫৮ জন বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। এ হিসেবে গড়ে প্রতি ১২ দিনে একজন বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে। মৃত্যুর হিসেবে বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী সীমান্তের একটি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত। যেখানে আলোচিত ফেলানী হত্যাকান্ডের কথা বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে গেঁথে আছে এবং বাংলাদেশের জনগন এ সীমান্ত হত্যার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে।
মালদ্বীপের বর্তমান সরকার ভারতের সঙ্গে শত্রুভাবাপন্ন না হলেও এর আগের সরকার ভারতের প্রতি বিরূপ ছিলো। যাহোক, মালদ্বীপের ভৌগলিক দূরত্বের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে দ্বীপ দেশটির ভূমিকা তুলনামূলকভাবে কম।
পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বলা যায়, আঞ্চলিক ছোট দেশগুলোর প্রতি বন্ধুত্বের পরিবর্তে কর্তৃত্বের মনোভাব পোষণ করার ফলে দক্ষিণ এশিয়ার সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভারত বিরোধিতা প্রকাশ্যে আসছে এবং ভারতের জন্য পরিস্থিতি জটিল করে তুলছে।

print