ছিটমহলের শিশুদের শিক্ষার হেরফের

223
কলাম

তৌহিদ-উল ইসলাম
‘শিক্ষার হেরফের’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ছেলে যদি মানুষ করিতে চাই, তবে ছেলেবেলা হইতেই তাহাকে মানুষ করিতে আরম্ভ করিতে হইবে, নতুবা সে ছেলেই থাকিবে মানুষ হইবে না। আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব এখানেই। এ স্তরের শিক্ষার সুফল পাওয়া যায় ছেলেদের শিক্ষার পরবর্তী স্তরসমূহে। শিক্ষানীতি ২০১২ পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়ায় ৫ বছর মেয়াদী প্রাথমিক শিক্ষাকাল আমাদের দেশে এ যাবৎ চালু রয়েছে। সুতরাং একটা শিশু ৫ বছরে শেষ করবে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর অতঃপর সে মাধ্যমিক স্তরে প্রবেশ করবে । সাত দশকের পুঞ্জীভূত কষ্টের অবসান ঘটিয়ে ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে আনুষ্ঠানিক ভাবে ভারত-বাংলাদেশের ছিটমহলগুলো বিনিময় হয়। সে অনুযায়ী ছিটমহল বিনিময়ের আজ ৫ বছর পেরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ভারতের নিকট থেকে আমাদের ফিরে পাওয়া ১১১টি ছিটমহলের ১৭১৫৮ একর আয়তন সম্বলিত ভূখণ্ডের ক‘জন শিশুই আজ শিক্ষার প্রাথমিক স্তর পাড়ি দিতে পেরেছে? এ নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়।
জনসংখ্যার দিক থেকে সর্ববৃহৎ ছিটমহল কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার দাসিয়ার ছড়া। যার আয়তন ১৬৪৩.৪৪ একর এবং জনসংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার । আয়তনের দিক থেকে এ ছিটমহলটি চতুর্থ। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিদ্যালয় বিহীন এলাকার জন্য ‘১৫শ প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্প’র অধীন ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে এ ছিটমহলের তিন প্রান্তে ৩টি বিদ্যালয়ে নির্মাণ কাজ শুরু হয়। তার ১টি বানিয়াটারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান শুরু করে। দ্বিতীয়টি কালিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ২০১৯ সালে ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান শুরু করে। অপরটি ছিটমহলের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত কামালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, যাতে এ বছর থেকে শুরু হয় পাঠদান কার্যক্রম, তবে অন্যগুলোর মতো ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত। সবগুলোতে বদলিভিত্তিক ২/৩জন করে শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চলতে থাকে। বছরে শিক্ষকের সংখ্যা হ্রাস পেতে পেতে কখনো তা ১জনে এসে দাড়ায়। আরেকটা বিদ্যালয় দেখা যায় নির্বাক হয়ে দাড়িয়ে আছে দাসিয়ার ছড়া ছিটমহলের পেটের ভেতরে। অর্থাৎ ১৬৪৩.৪৪ একর আয়তনের দাসিয়ার ছড়ার ভেতর বাংলাদেশের ৩৪.৬৮ একর আয়তনের চন্দ্রখানা ছিটমহলে এ বিদ্যালয়টির অবস্থান। এ ছিটমহলটি ফুলবাড়ী সদর ইউনিয়নের ৬নং চন্দ্রখানা ওয়ার্ডের বিচ্ছিন্ন অংশ ছিল। বিদ্যালয়টির নাম উত্তর চন্দ্রখানা প্রাথমিক বিদ্যালয়। এটি ১৯৯৪ সালে স্থাপিত হয়ে স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় চলে আসছিল। তবে কড়িডোর না থাকায় বা ছিটমহল বিনিময় না হওয়ায় তা শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক সে সময় রেজিস্টার্ড হয়নি। বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি নজির হোসেন জানান, ছিটমহল বিনিময় হবার পর বিদ্যালয়টি জাতীয় করণের জন্য তারা মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করেন। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে কোন আশ্বাস না পাওয়ায় ২০১৬ সালে এ বিষয়ে হাইকোর্টে রিটপিটিশন দাখিল করেন। হাইকোর্ট থেকে রুল জারি করা হলে স্থানীয় শিক্ষা অফিস ক্ষুব্ধ হয়ে বিদ্যালয়ে সরকারের বিনামূল্যের পাঠ্যপুস্তক বন্ধ করে দেন এবং একই সাথে পিইসি পরীক্ষা বন্ধ করে দেন। ফলে বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
দাসিয়ার ছড়ায় পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া শিক্ষার্থী রয়েছে অনেক, তবে তাদেরকে স্কুলে পৌঁছতে পারি দিতে হয় ২/৩ কি.মি রাস্তা। দেশের মূলভূখণ্ডে এ দূরত্ব ১কি.মি মধ্যে সীমাবদ্ধ। ছিটমহল বিনিময় আন্দোলনের বাংলাদেশ পার্টের সাবেক সভাপতি মইনুল হকের সাথে আলাপচারিতায় জানা যায়, বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় দাসিয়ার ছড়ার আয়তন ও লোকসংখ্যার অনুপাতে এখানে আরও ৩/৪টি বিদ্যালয়ের প্রয়োজন।
আমাদের দেশে চালু রয়েছে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা। পথশিশু, অনাথ শিশু ও উপকূলীয় শিশুদের মতো এখানেও ব্যাহত হতে দেখা যাচ্ছে ১৯৮০ সালের বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন।
লালমনিরহাট সদরে অবস্থিত বাঁশপচাই ছিটমহলে বসবাস করে ২২৭টি পরিবার। ছিটমহল বিনিময়ের প্রাক্কালে এখানে সালেহা সরকার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে একটি বিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। কিন্তু রেজিস্টার্ড বা জাতীয়করণকৃত না হওয়ায় উপজেলা শিক্ষা প্রশাসন তা আদৌ তদারকি করেন না। একই কারণে সেখানে অধ্যনরত শিক্ষার্থীদের মিলছে না উপবৃত্তি। সব দিক থেকে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা । এখান থেকে অন্যান্য সরকোরি বিদ্যালয়ের দূরত্ব দেড় থেকে দুই কি.মি। প্রধান শিক্ষক শিরিনা খাতুন জানান, এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতি বছর পিইসি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে আসছে।
লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলায় ছিটমহলের সংখ্যা সর্বাধিক। ছিটমহল বিনিময়ের সাথে সাথে এখানকার শিশুশিক্ষা এক শ্রেণির মানুষের ব্যাবসা হয়ে পড়ে। অসংখ্য সংবাদপত্রে তা শিরোনাম হয়েছিল। পাটগ্রামের ৫৫টি ছিটমহলের মধ্যে আয়তনে বড় এমন ৪টি ছিটমহলে ১টি করে বিদ্যালয় নির্মাণের কাজ শুরু করে ২০০১৬-১৭ অর্থবছরে সরকারের ‘১৫শ প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্প। সেগুলো হলো, ৮নং ভোটমারী ছিটমহলে ভেটমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৪নং লতামারী ছিটমহলে লতামারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২১নং পানিশালা ছিটমহলে পানিশালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ১১৯নং বাঁশকাটা ছিটমহলে বাঁশকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এ বিদ্যালয় ৪টির নির্মাণ কাজ শেষে তা দখল করে নেন পাশে অবস্থিত পূর্বের বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। সরকারি শিক্ষা অফিস পাঠদান কার্যক্রম চালু করার আগেই তারা নিজেদের চালু করা বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের সেখানে নিয়ে গিয়ে পাঠদান শুরু করেন। সরকারের শিক্ষা কর্তৃপক্ষের সাথে শুরু হয় তখন নানা টানাপোড়ন। বছর ধরে তার খেসারত দিতে হলো শিশুশিক্ষার্থীদের। তাদের ভাগ্যে জুটলো না উপবৃত্তি, জুটলো না মান সম্মত শিক্ষা। এ ছাড়াও ২৩নং দাড়িকামারী ছিটমহল, ১২০নং বাশকাটা ছিটমহল ও ১৩০নং খানকি বাশকাটা ছিটমহলে বেসরকারি বিদ্যালয় স্থাপন করে একই ভাবে কিছু লোক শিশুশিক্ষার হেরফের ঘটিয়েছেন। তবে সরকারি ৪টি বিদ্যালয়ে চালু হয়নি এখন পর্যন্ত ৫ম শ্রেণি।
পঞ্চগড়ে ছিটমহলের সংখ্যা ৩৬টি, তন্মধ্যে ১৭টিতে জনবসতি নেই। কয়েকটা জনবসতি বিহীন ছিটমহলেও সে সময় গড়ে ওঠেছিল ব্যক্তিস্বার্থে বিদ্যালয়। এমনই করে এখানে ৩৪টি বেসরকারি বিদ্যালয় সৃষ্টি হয়েছে এবং সবগুলো আজ মুখথুবরে পড়ে আছে। হয়তো তাদের উচিত শিক্ষা হয়েছে। মাঝখানে শিশুদের শিক্ষা নিয়ে ওরা একটা তামশা করে গেল এবং শিশুরা হলো তাদের উচিত শিক্ষার একমাত্র শিকার। এখানেও ৫টি বড় ছিটমহলের মধ্যে ১টি করে বিদ্যালয় নির্মাণের কাজ ২০০১৬-১৭ অর্থবছরে শুরু করে সরকারের ‘১৫শ প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্প। সেগুলো হলো, দোহলা খাগড়া বাড়ী ছিটমহলে দোহলাখাগড়া বাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কোটভাজনী ছিটমহলে কোটভাজনী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বালাপাড়া ছিটমহলে বালাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গাড়াতী ছিটমহলে গাড়াতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং কাজলদীঘি ছিটমহলে কাজলদীঘি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। দোহলা খাগড়া বাড়ীর আয়তন ২৬৫০.৩৫ একর, যা ্আয়তনের দিক থেকে সর্ব বৃহৎ্ এবং জনসংখ্যা প্রায় দশ হাজার। আয়তন ও লোকসংখ্যা অনুপাতে এখানে বিদ্যালয় অপ্রতুল বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারনা। অনুরূপ ভাবে কোটভাজনীর আয়তন ২০১২.২৭একর ও জনসংখ্যা প্রায় ৮হাজার হওয়ায় এখানেও বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানোর দাবি এলাকাবাসীর। অন্যদিকে শালবাড়ী ছিটমহলের আয়তন ১১৮৮.৯৩ একর ও জনসংখ্যা প্রায় ২হাজার থাকার পরও সেখানে কোন বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়নি। ইতোমধ্যে সরকারের নির্মিত বিদ্যালয় ৫টিতে জোড়াতালি দিয়ে পাঠাদান শুরু হলেও আজ পর্যন্ত কোনটিতেও ৫ম শ্রেণি চালু করা সম্ভব হয়নি। এখানেও ৫মশ্রেণি পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় আন্দোলনের বাংলাদেশ পার্টের সাবেক সমন্বয়কারী গোলাম মোস্তফার সাথে ছিটমহলের শিশুদের শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে আলোচনার এক পর্যয়ে তিনি জানান, ছিটমহলে সরকারের সব ধরনের উন্নয়ন দ্রুত ঘটলেও প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন বিলম্বিত হচ্ছে। মূলভূখণ্ডের শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে এর পার্থক্য এখনো চোখে পরার মতো।
চলুন এবার ছিটমহল থেকে বেড়িয়ে ফিরে যাই কবি গুরুর ‘শিক্ষার হেরফের’ প্রবন্ধে। এ প্রবন্ধের শেষে একটা গল্প আছে, সেটা বলেই শেষ করছি। এক দরিদ্র্যলোক শীতের কাপড় কেনার জন্য অল্প অল্প করে সঞ্চয় করে যখন শীতের কাপড় কিনে ফেলেন, তখন গ্রীষ্মকাল এসে যায়। এবার অনুরূপ ভাবে গরমের কাপড় কেনার জন্য আস্তে আস্তে সঞ্চয় করতে থাকেন এবং এক সময় তা কিনে ফেলেন। কিন্তু তখন শীতকাল এসে পৌঁছায়। এবার দেবতা তার দৈন্য দেখে বর দিতে সম্মত হলেন। তখন দরিদ্র্য লোকটি বলল, আমি আর কিছুই চাই না, আমার এই হেরফের ঘুচিয়ে দাও। আমি সারা জীবন ধরে গ্রীষ্মের সময় শীতবস্ত্র ও শীতের সময় গ্রীষ্মবস্ত্র লাভ করি, এটা যদি একটু সংশোধন করে দাও, তাহলে আমার জীবন সার্থক হয়।
পুনশ্চ: বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন যা দৃশ্যমান হয় তার ষোলআনাই চোখে পরবে অধুনালুপ্ত ছিটমহলগুলোতে। শুধু শিশুশিক্ষার এই হেরফেরটুকু ঘোচাতে পাড়লে সকল উন্নয়ন সার্থক ও সুন্দর হয়ে ওঠে।

print