জামালপুরে ভুয়া শ্রমিক দেখিয়ে ইজিপিপি প্রকল্পের অনিয়ম দূর্নীতি

58
জামালপুর

রোকনুজ্জামান সবুজ, জামালপুর 

জামালপুরের সরিষাবাড়িতে ভুয়া শ্রমিক দেখিয়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে অতিদরিদ্রের জন্য চল্লিশ দিনের কর্মসংস্থান কর্মসূচীর (ইজিপিপি) প্রকল্পের প্রায় পৌনে ৩ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ উঠেছে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। এতে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা লাভবান হলেও বঞ্চিত হয়েছে হতদরিদ্র হাজারো নারী-পুরুষ শ্রমিক। আর ভেস্তে গেছে সরকারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য । দীর্ঘ এক বছর আগে জালিয়াতির মাধ্যমে শ্রমিকদের টিপসহি জাল করে ব্যাংক থেকে এই টাকা উত্তোলনের ঘটনা ফাঁস হওয়ায় তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের পাশপাশি সাধারন জনগনের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। উচ্চপর্যায়ে তদন্তের মাধ্যমে এসব দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ও তালিকাভুক্ত হতদরিদ্র নারী-পুরুষ শ্রমিকদের প্রাপ্য মজুরীর টাকা প্রদানের দাবি জানিয়েছেন বঞ্চিতরা। [
জামালপুরের সরিষাবাড়ি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে (দ্বিতীয় পর্যায়) ৫৯টি ওয়েজকষ্ট প্রকল্পের ৩ হাজার ২৪০ জন হতদরিদ্র নারী-পুরুষ শ্রমিকের অনুকুলে ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা ৩৮ হাজার টাকা এবং নন ওয়েজকষ্টের ১২টি প্রকল্পের অনুকুলে ১০ লাখ ১৫ হাজার ৮৯২ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। উপজেলা পরিষদের গৃহীত এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নিয়মানুযায়ি প্রকল্প এলাকার দর্শনীয়স্থানে প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থ ও শ্রমিকের সংখ্যাসহ প্রকল্পের বিবরণ উল্লেখ করে সাইনবোর্ড টাঙ্গানো, প্রতিটি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য/সদস্যাকে চেয়ারম্যান, একজন মহিলা সদস্য, স্কুলের একজন শিক্ষক প্রতিনিধি, চেয়ারম্যানের মনোনীত মহিলা, ও একজন ধর্মীয় নেতাকে সদস্য করে ৫-৭ সদস্যের একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠণ করার কথা। পিআইসি কমিটি ছাড়াও সরকারি দপ্তরের একজন অফিসার (টেগ অফিসার) ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের একজন ফিল্ড সুপারভাইজার তদারকি করবেন। যেখানে ফিল্ড সুপারভাইজার থাকবেন না, সেখানে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নিজেই তদারকী করে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে প্রকল্পের কাজে অগ্রতি প্রতিবদেন দাখিল করবেন। সপ্তাহ শেষে শ্রমিকরা তাদের নামে তফসিলি ব্যাংকে খোালা হিসাবে জমাকৃত মজুরীর টাকা চেকের মাধ্যমে উত্তোলন করার নিয়ম। ইজিপিপি প্রকল্পের পরিপত্রে এই নিদের্শনা থাকলেও তা উপেক্ষা করে অনিয়ম ও দূর্নীতির আশ্রয় নিয়ে হাজারো শ্রমিকের নামে বরাদ্দকৃত পৌনে ৩ কোটি টাকা ভূয়া টিপ স্বাক্ষর দিয়ে ব্যাংক থেকে উত্তোলন করে আত্নসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
সরিষাবাড়ি উপজেলার ইজিপিপি প্রকল্পের প্রায় পৌনে ৩ কোটি লোপাটের ঘটনার বিষয়ে সরেজমিনে খোঁজ নেয়ার জন্য সাতপোয়া ইউনিয়নের দাসেরবাড়ি গ্রামে গিয়ে ইউজিপিপি’র তালিকাভুক্ত শ্রমিক গো-খামারী বেলাল তার স্ত্রী, চাচাতো ভাই, চাচা,চাচী, শশুর-শশিুড়ি, ফুপু-ফুপা ও আত্নীয়-স্বজন ছাড়াও আশপাশের ২৪ সদস্যের সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের । তাদের অভিযোগ, শ্রমিক হিসেবে তারা কখনই কাজ করেনি এমনকি ব্যাংক থেকে কোন টাকা উত্তোলন করেননি। শ্রমিকের তালিকায় তাদের পরিবারের সদস্যদের নাম অর্ন্তভুক্ত করায় সামাজিক ভাবে তাদেও মর্যাদার ক্ষন্নি হয়ে বলেও অভিযোগ করেন। একই ইউনিয়নের চর সরিষাবাড়ি গ্রামের মালশিয়া প্রবাসী শামছুল হকের স্ত্রী মমতা, শান্তি বেগম, আঞ্জুয়ারা, সুফিয়া, শেফালীসহ ইজিপিপির তালিকাভুক্ত প্রায় ২০ জন নারী-পুরুষের কথা বলে জানা গেছে, তারা মোটামুটি সবাই স্বচ্ছল। শ্রমিকের তালিকায় নাম দিয়ে ব্যাংক হিসাব খুলে টাকা উত্তোলনের বিষয়টি তারা জনেন না। শুধু এসব পরিবার নয় চরসরিষাবাড়ি গ্রামের ১২০ জন নারী-পুরুষকে ইজিপিপির তালিকাভুক্ত করা হলেও এই কাজের বিষয়ে কিছুই জানেন না তারা।
উপজেলার ডোয়াইল ইউনিয়নের হাটবাড়ি গ্রামের তসলিম উদ্দিনের পুত্র মুদির দোকানী বাদল মিয়া, তার প্রবাসী ভাই রাশেল, গামেন্টস কর্মী আব্দুল কাইয়ুম, হেলাল ও তারস্ত্রী, ভাই অন্যান্য স্বজন ছাড়াও হারুন অর রশিদ ও তার মৃত পিতা গোলজার হোসেনসহ, এলাকার কৃষক,ব্যবসায়ী ও নেতাসহ এলাকার মেম্বার রুবেলের আত্নীয়-স্বজনসহ একই পরিবারের ৪-৫ জন করে সদস্যসহ এই এলাকার ৪৩ জন নারী-পুরুষের নাম রয়েছে ইজিপিপির প্রকল্পের শ্রমিকদের নামের তালিকায়। তবে এসব শ্রমিক কোন কাজ করেনি এমনকি কোন টাকা পাননি বলে অভিযোগ তাদের। তাদেও অভিযোগ তাদেও টিপ-স্বাক্ষর জাল করে ব্যাংক থেকে মজুরীর টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। ভুক্তভোগিদের স্বাক্ষাতের সময় ডোয়াইল ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের মেম্বার রুবেল উপস্থিত ছিলেন। এবিষয়ে তার বক্তব্য চাওয়া হলে এই প্রতিবেদকে বলেন, আমি নিজেই কিছুই জানি না, আপানাকে কি বলবো। আগে আমি নিজে জানবো, পরে আপনাকে জানাবো।
একই ইউনিয়নের বালিয়া গ্রামের তৈয়ব আলী। তাকে এবিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, তার ও তার পুত্র আব্দুর কদ্দুছের নাম শ্রমিকের তালিকায় রয়েছে তা তিনি জানেন না। তার ছেলে ঢাকায় একটি মিলে চাকুরী করেন। এছাড়া মহিলা মেম্বারের দেবর, ভাসুর, ননদসহ স্বজনসহ আশপাশের ১০/১২ জনের শ্রমিকের তালিকায় নাম থাকলেও তারা তারা কোনদিনই প্রকল্পের মাটির কাজ করেনি টাকাও পাননি। তবু তালিকায় তাদেও নাম কিভাবে এলো। একই ইউনিয়নের রায়েদার পাড়া ও চাপাকোনা গ্রামের স্বচ্ছল অনেক মানুষের নাম শ্রমিকের তালিকায় রয়েছে। তারাও এবিষয়ে কিছুই জানেন না।
সরিষাবাড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের একাধিক সুত্র জানিয়েছেন, শুধু সাতপোয়া ও ডোয়াইল ইউনিয়ন নয়। উপজেলার ৮ ইউনিয়নের ৩ হাজার ২৪০ জন শ্রমিকই ভুয়া। তারা কোন টাকা পাননি। তারা আরো বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের ভিজিএফ, ভিজিডি ও অন্যান্য কাজের আসা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নেয়া ভোটার আইডিকার্ড ও ছবি নিয়ে শ্রমিক সাজিয়ে স্থানীয় তফসিলি ব্যাংকগুলোতে হিসাব খোলা হয়। পরবর্তীতে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জাল টিপ স্বাক্ষর দিয়ে শ্রমিকদের নামে ব্যাংকে জমাকৃত টাকা পিআইও এবং ব্যাংক ম্যানেজারদের যোগসাজশে তা উত্তোলন করে ভাগবাটোয়ারা করে নেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা পরিষদের একজন কর্মকর্তা বলেন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ইজিপিপির দ্বিতীয় কিস্তিতে কোন কাজ হয়নি। ২০১৯ সালের ২৩ জুন এই টাকা ফেরৎ দেয়ার আলোচনা চলছিল। কিন্তু রহস্যজনক কারণে হঠাৎ তড়িগড়ি করে ৩০ জুনের আগেই ৩ হাজার ২৪০ জন নারী-পুরুষ শ্রমিকের ব্যাংক হিসাবে জমা করে তা উত্তোলন করা। পরে পিআইও’র যোগসাজশে প্রকল্প সংশিষ্টরা ব্যাংক থেকে বিল উত্তোলন করে ভাগবাটোয়া করে নেনন।
ইজিপিপির তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের টাকা না পাওয়ার বিষয়ে ডোয়াইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোঃ নাসির উদ্দিনের রতনের কার্যালয়ে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে মোবাইল ফোনে তার কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, দিন ২০০ টাকা মজুরী থেকে ২৫ টাকা সঞ্চয়ী রাখার পর ১৭৫ টাকায় কোন শ্রমিক কাজ করতে চায় না । এজন্য এভাবে কাজ করতে হয়। তবে শ্রমিকদের ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা উত্তোলনের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।

ইজিপিপির তালিকায় ভুয়া শ্রমিকের নাম ও তাদের জাল টিপ স্বাক্ষর দিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের বিষয়ে সাতপোয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু তাহেরের সাথে মোবাইল মোনে যোগাযোগ করা হলে বিষয়টি তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান এবং বলেন, এতো এক বছর আগেই কাজ শেষ হয়ে গেছে। এখন এসব জেনে কি হবে।
কাজ না করেই ভুয়া শ্রমিক দেখিয়ে ইজিপিপি প্রকল্পের ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা আত্নসাতের বিষয়ে সরিষাবাড়ি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা হুমায়ুন কবিরের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোন মন্তব্য করেনি।
তবে সরিষাবাড়ি নির্বাহী অফিসার শিহাব উদ্দিন আহমেদ বলেন, এবিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। যদি এধরণের কোন অভিযোগ পাওয়া যায়। তা খতিয় দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ইজিপিপি প্রকল্পের টাকা লোপাটের বিষয়ে জামালপুর জেলা ত্রাণ ও পুণর্বাসন কর্মকর্তা মোঃ নায়েব আলীর দৃষ্টি আকর্ষন করা হলে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, দপ্তরে এধরণের অভিযোগ আসেনি। যদি এই অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে তদন্ত পূর্ব্বক প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জামালপুর জেলা প্রশাসনের উর্ধতন একজন কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেন, দারিদ্রপিড়িত গ্রামীণ জনপদের কর্মহীন সময়ে অতিদরিদ্র নারী-পুরুষ শ্রমিকদের চল্লিশ দিনের দু’বেলা দু’মুঠো খাবার নিশ্চিত করতে সরকার ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রনালয়ের’ অধীনে এই কর্মসূচী চালু করে। কিন্তু প্রকল্পের শুরু থেকেই রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি ঝেঁকে বসে প্রকল্পটিতে। শুরু হয় কোটি টাকা লোপাটের প্রতিযোগিতা। এতে সরকারে প্রশংসনীয় এই উদ্যোগটি প্রায় ভেস্তে যেতে বসেছে । শুধু তাই নয় দুর্নীতিবাজদের কারণে সরকারের এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে থাকেন এ জেলার হাজার হাজার অতিদরিদ্র নারী-পুরুষ শ্রমিকরা।
এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের অনিয়ম, দুর্নীতি ও লোপাটের সাথে যেসব সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধি জড়িত রয়েছেন উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এমনটাই প্রত্যাশা সচেতন মহলের।

print