তৈল যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা

932
Lutfor Rahman Himel

প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর কোথায় তেল আছে— তা আয়ত্তে এনে পৃথিবীতে তেল তোলার ব্যাপক খননকার্য শুরু হয়। জ্বালানি তেলের ইতিহাসের সঙ্গে মিশে আছে যোগাযোগের ইতিহাস। খাওয়ার তেলের ইতিহাসও বহু পুরানা। আর মানুষের গায়ে ব্যবহারের তেল? সেটির ইতিহাস আরও প্রাচীণ। এই বঙ্গদেশও তেলে ডুবে আছে। সেসব অবশ্য তুলতে হয় না। এমনিতেই গড়িয়ে পড়ে। চুইয়ে পড়ে। কতক উপচে পড়ে। এই তেল মাখামাখির, মানে গায়ে মাখার তেল। আশংকা করছি, এই তেল উৎপাদনে এবং ব্যবহারে এই মূহুর্তে আমরাই শীর্ষে অবস্থান করছি।

এ বইটি যখন লিখতে বসেছি, মাথা ঘেমে নেয়ে মানে তেলে তেলে একাকার অবস্থা। কঠিন এক বিষয় বৈকি! শরীর থেকে ঘাম নয়, বের হচ্ছে তেল। তৈলবিশারদ শ্রীযুক্ত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তৈল নিয়ে বেশিদূর আগাননি কী কারণে— এখন টের পাচ্ছি। আমি নির্বোধ, স্বল্প জ্ঞানে সেই পিচ্ছিল পথে সামনে আগানোর বৃথা চেষ্টা করছি।
যাই হোক, লিখতে যখন বসেছি, কিছু একটা লিখতেই হবে। তা-ই লিখছি।

সবকিছুতেই তেল এখন জড়িয়ে মানে ভিজিয়ে আছে। তেল আমাদের আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছে মানে ভিজিয়ে রেখেছে আমাদের। তেল ছাড়া আমাদের চলেই না। তেল ছাড়া আমাদের কল্পনা শক্তিও এখন অচল।
তিলে তৈল হয়, কৈয়ের নিজেরও তৈল আছে। সে তেলেও তাকে মানে কৈকে ভাজা যায়। যোগাযোগবিদরা বলেন, সময় এখন তথ্যের, যোগাযোগের। আমি দেখি সময় এখন তেলের।
পান্থপথে এক গ্রীস্মে দেখেছিলাম এক রিকসাচালক বিশ্রাম নিচ্ছেন, ঘেমে নেয়ে একাকার অবস্থা তার। বিশ্রাম নিতেই পারেন তিনি। কিন্তু আমি তার দিকে তাকালাম, দেখি তার শরীর থেকে ফোটায় ফোটায় ঘাম আই মিন তেল ঝরছে। এক যুবক দৃশ্যটি দেখে তাকে এক বোতল তেল মানে মিনারেল ওয়াটার দিয়ে তার সঙ্গে একটি সেলফি তুলে ফেললেন। বুঝতে পারলাম তিনি এটা সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করবেন! যুগের হাওয়া ব’লে কথা। ফলে তার ওই কর্মটিও তেল বলেই ভ্রম হল। এরপর নিশ্চয়ই ছবিটি দেখে তার অসংখ্য ফ্রেন্ডস অ্যান্ড ফলোয়ার সেই যুবককে প্রশংসায় আই মিন তেলে ভাসাবেন। এখানেও সেই তেলমর্দন। তেল মানেই খারাপ কিছু, সেটি বলছি না। সেলফির লোভে না হয় তৃষ্ণার্ত লোকটি এক বোতল তেল মানে পানি পেলই। তাতে খারাপ ত কিছু নেই।

ঢাকা শহরের হাজার হাজার যন্ত্রের গাড়ি চলে তেলে। বিরোধী দল লাগবে না— একদিন তেল বন্ধ করে দিলে ঢাকা অচল হবে। এ কারণেই শাস্ত্রীজি বলে গেছেন, এক তৈলে চাকাও ঘোরে, এক তৈলে মনও ফেরে। এই মন ফেরানোর বিষয়কে কেন্দ্র করেই উপরোক্ত শিরোনামের বইখানি লেখার বাসনা নিয়ে আজকে বসেছি আপনাদের সামনে।

বলতে পারেন, গণযোগাযোগের মত এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বইয়ে তৈলযোগাযোগ কেন জায়গা করে নিল? হ্যাঁ, সে প্রশ্ন আপনি করতেই পারেন। জবাব হচ্ছে, আমার ধারণা, এমন নামের কারণে বইটির কাটতি হু হু ক’রে বাড়তে পারে। যুগ এখন সার্কুলেশনের। যুগ এখন কাটতির। দ্বিতীয়ত, আগেই বলেছি, তেল এখন সর্বত্র। গণ যোগাযোগ ও সাংবাদিকতাও সেই সর্বত্ররই অংশ। বর্তমান প্রাসঙ্গিকতায় সাংবাদিকতা করতে গেলে শুধু বইয়ের জ্ঞান, ব্যবহারিক জ্ঞান থাকলেই চলে না, তৃতীয় যোগ্যতা হিসেবে তেল তথা তৈল ব্যবহারের দক্ষতা থাকতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি সাংবাদিকের তৃতীয় বা দ্বিতীয় নয়, প্রথম যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়।

বড় আফসোসের কথা হল, অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও তৈল বা তৈলপ্রদান সংক্রান্ত বিষয়াদি গণযোগাযোগের ক্লাস বা মাঠ পর্যায়ে কখনো শেখানো হয় না। এ এক অত্যাশ্চর্য বিষয়। বেশিরভাগেই একা একাই এর চর্চা করবে, কিন্তু কেউ কাউকে শেখাবে না। এর একাডেমিক কোনো ফর্মেটও নেই, কারিকুলামও নেই। এ এক বড় রহস্য!

print