পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণ জরুরি

202
নজরুল ইসলাম ভুঁইয়া

নজরুল ইসলাম ভুঁইয়া

বৃক্ষ মানুষের পরম বন্ধু। মহান আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করে তাদের জন্য ফলবান বৃক্ষরাজি ও সবুজ-শ্যামল বনভূমির দ্বারা এই বাসভূমিকে সুশোভিত ও সৌন্দর্যমন্ডিত করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির অপরূপ সৌন্দর্যলীলার মধ্যে বৃক্ষরাজি অন্যতম, যা ছাড়া প্রাণিককুলের জীবন-জীবিকা অসম্ভব। সৃষ্টির শুরু থেকে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী বৃক্ষের উপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বৃক্ষের গুরুত্ব উপলব্ধি করে বলেছেন, ‘আমরা যেমন স্নান করি এবং শুভ্র বস্ত্র পরিধান করি, তেমনি বাড়ির চারপাশে যত্নপূর্বক একটি বাগান করে রাখা ভদ্রপ্রথার একটি অবশ্য কর্তব্য অঙ্গ হওয়া উচিত। আবহাওয়া এবং জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষায়, পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের উপযোগী করতে এবং মানুষের জীবন-জীবিকা নির্বাহে, খাদ্যের উৎস, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, চিত্তবিনোদন এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষায় বনায়নের গুরুত্ব অপরিসীম। পৃথিবীতে মানুষের খাদ্য, বস্ত্র, ওষধ, ঘরবাড়ি তৈরি, পরিষ্কার পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা, বন্যা, জলোচ্ছাস, খরা, ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি ও বন্যা প্রতিরোধে, ভূমির ক্ষয়রোধে, উর্বরতা বাড়াতে, নদীর ভাঙন থেকে ভূভাগকে রক্ষা, কৃষি জমির উৎপাদন বৃদ্ধি করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষের কল্যাণ সাধন ও বেকারত্ব দূর করার ক্ষেত্রে বৃক্ষের ভূমিকা অনেক। তাই বৃক্ষহীনতা যেকোনো দেশের জন্য, যেকোনো জাতির জন্য অভিশাপ স্বরূপ। অনেক মানুষের পদভারে কম্পিত এ সুজলা-সুফলা পৃথিবী প্রতিদিন বৃক্ষশূন্য হচ্ছে। অবাধ ও নির্বিচারে চলছে বৃক্ষনিধন। ফলে প্রাণীর জীবনধারণের নিয়ামক অক্সিজেনের সরবরাহ হ্রাস পাচ্ছে প্রবলভাবে। অথচ আমরা কোনো কারণ ছাড়াই অথবা সামান্য কারণ দেখিয়ে বন উজাড় করে ফেলি। গাছপালা শুধু কার্বন ড্রাই-অক্সাইড গ্রহণ করে এবং অক্সিজেন ত্যাগ করে উপকারের পরিসমাপ্তি ঘটায় না। বড় বৃক্ষ বজ্রপাত প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে। পরিবেশ বিপর্যয়ের জন্য আজ প্রতিদিন বজ্রপাতে মানুষ মারা যাচ্ছে। দেশে অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, পাহাড়ধস, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বনাঞ্চল না থাকলে প্রাকৃতিক পরিবেশ হয়ে উঠত উষ্ণ, পৃথিবী হয়ে উঠত মরুভূমি এবং মানুষের অস্তিত্ব হতো বিপন্ন। প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়ার জন্য মানুষই দায়ী। যদিও অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য মানুষের ঘরবাড়ি, চাষাবাদ ও শিল্পায়নের জন্য প্রচুর জমিজমা লাগছে। ফলে বন-জঙ্গল কেটে এসব প্রয়োজন মেটানো হচ্ছে। এতে পশুপাখি অন্ন ও বাসস্থান হারাচ্ছে এবং অন্য জীববৈচিত্র্য লোপ পাচ্ছে। এমন মহাবিপর্যয় পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের পাশাপাশি আমাদেরকে অবশ্যই সামাজিক বনায়ন গড়ে তুলতে হবে। বৃক্ষ নিধনের ফলে বাতাস দূষিত হচ্ছে, ক্ষয় হচ্ছে মাটি। নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। বিলীন হয়ে যাচ্ছে অতুলনীয় সবুজ সৌন্দর্য। মানুষ ও প্রাণীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সবুজ বৃক্ষরাজি ও বনায়নের গুরুত্ব অপরিসীম। বনাঞ্চল বাসভূমির শোভা বাড়ায়, বায়ুমন্ডলকে বিশুদ্ধ ও শীতল করে। যেখানে গাছপালা ও বনভূমি বেশি, সেখানে ভালো বৃষ্টিপাত হয়। ফলে ভূমিতে পানির পরিমাণ বাড়ে, চাষাবাদ ও ফসল ভালো হয়।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বাসযোগ্য সুন্দর পৃথিবী গড়তে বৃক্ষনিধন নয়, বৃক্ষরোপনই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশের ভারসাম্য ও সুষম জলবায়ুর প্রয়োজনে একটি দেশের আয়তনের কমপক্ষে ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োজন । কিন্তু বাংলাদেশের সরকারি হিসাবে বনভূমির পরিমাণ মোট ভূভাগের ১৬ ভাগ উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে রয়েছে ৮-১০ ভাগ। তাই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে অবশ্যই সামাজিক বনায়ন গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সমদ্র উপকূলবর্ত্তী সুন্দরবন, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের বনভূমি, ময়মনসিংহ, গাজীপুর ও টাঙ্গাইল জেলা এবং রংপুর ও দিনাজপুরের কিছু অঞ্চল বনভূমি। সুন্দরবন বাদ দিলে বন বলতে যা অবশিষ্ট থাকে তা খুবই নগণ্য। ওয়াল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউটের মতে, এর পরিমাণ মাত্র পাঁচ শতাংশ। এক সময় বাংলাদেশের ২৮টি জেলায় কোনো বনায়ন কার্যক্রম ছিল না। এখন প্রায় সবকটা জেলাতেই সামাজিক বনায়ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশে রয়েছে বনায়নের বিপুল সম্ভাবনা। এ সম্ভাবনাকে সুষ্ঠভাবে কাজে লাগাতে হবে। পরিকল্পিত একটি বাগানই হতে পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আয়ের উৎস। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য দেশ গড়ে তুলতে হলে বৃক্ষরোপণকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে, ছড়িয়ে দিতে হবে সবার মাঝে। প্রত্যেক ব্যক্তিকে হতে হবে বৃক্ষপ্রেমি। বিশেষ দিনগুলোকে উপলক্ষ করে বৃক্ষরোপণ করলে সেটা ভালো কাজ দেবে। যেমন জন্মদিন, সন্তানের প্রথম স্কুলে যাওয়ার দিন, বিবাহবার্ষিকীতে, বিখ্যাত ব্যক্তিদের নামে, পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের দিনে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বা অন্য কোনো বিশেষ কারণে। চিরচেনা গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত ঋতুর বিশৃঙ্খল আচরণ থেকে পরিত্রাণ পেতে বেশি করে গাছ লাগানো উচিত। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে উখিয়া ও টেকনাফের কয়েক হাজার একর বনভূমি উজাড় হয়েছে, বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ডে জমি অধিগ্রহণ, অর্থনৈতিক অঞ্চল, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও অপরিকল্পিত উন্নয়নে বনভূমি কমে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে আরো পরিকল্পনা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি পেলে প্রকৃতি এবং পরিবেশ রক্ষা পাবে। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শিশু-কিশোরদের যদি বৃক্ষপ্রেমী হিসেবে গড়ে তোলা যায় তাহলে সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন দেশ ভরে উঠবে সবুজে সবুজে। বলা হয়, ‘বৃক্ষরোপণ করে যে, সম্পদশালী হয় সে’। যে অঞ্চলে বনভূমি কম সেখানে বৃক্ষরোপণ অভিযান জোরদার করতে হবে। বৃক্ষরোপণে সরকার, এনজিওসহ নানা প্রতিষ্ঠান এবং আমাদের পারিবারিক ও সামাজিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে। আসুন, আমরা গাছ লাগাই, গাছের পরিচর্যা করি এবং পরিবেশ রক্ষায় সচেষ্ট হই।
প্রত্যেক প্রাণীই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শক্তির জন্য উদ্ভিদের ওপর নির্ভরশীল। অসংখ্য প্রজাতির প্রাণীর খাদ্য ও বাসস্থানের ব্যবস্থা উদ্ভিদই করে থাকে। পরিবেশ দূষণ কমিয়ে, সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে উদ্ভিদ মানুষের শারীরিক-মানসিক স্বাস্থ্য উন্নতিতে ভূমিকা রাখছে। শিল্পায়ন-নগরায়নের গতি থামানো সম্ভব নয়, তাই উন্নয়ন ও সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা দরকার। আজকাল ঘটা করে পালিত হয় পরিবেশ দিবস। তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। গাছ লাগানোর জন্য চাই গাছের প্রতি প্রকৃত ভালবাসা-প্রেম। চাই আধুনিক মানুষের যান্ত্রিক মানসিকতার পরিবর্তন। পরিবেশ নিয়ে আমাদের উদ্বেগ ক্লাশরুম, সেমিনার, সভা সমিতি আর ভাষণেই সীমিত থাকলে চলবে না, তার বাস্তব প্রতিফলন দরকার। বর্তমানে আমাদের দেশে পরিবেশ বিদ্যা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আগামীতে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকেই পরিবেশ বিদ্যা শিক্ষাদান প্রয়োজন। মানুষ যতই সভ্য হোক, বিজ্ঞানের যতই বিকাশ ঘটুক, প্রকৃতিকে অবজ্ঞা করে মানুষ-সভ্যতা টিকে থাকতে পারে না, দেরিতে হলেও মানুষ আজ তা অনুধাবন করছে।
চলছে বর্ষাকাল। বৃক্ষচারা রোপণের উপযুক্ত সময়। আসুন সবাই মিলে নিজ বাড়ির আঙ্গিনায়, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ, মাদ্রাসাসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, সড়কপথ, রেলপথের দু-ধার, পাহাড়, টিলা, উপকূলীয় বিস্তীর্ণ এলাকা, খাল-বিলের পাড়, বেড়িবাঁধ, আশপাশে ফাঁকা জায়গায় প্রচুর পরিমাণে ফলদ, বনজ ও ভেষজবৃক্ষ রোপণ করে সামাজিক বনায়ন সৃষ্টি করি।
আমাদের শহরকে বসবাসের উপযোগী ও সবুজায়ন করতে ছাদবাগান কর্মসূচির মাধ্যমে গাছ লাগাতে হবে। মানুষের প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য বিভিন্ন পার্কে, সড়কের দুপাশে ও বিভিন্ন ফাঁকা জায়গায় গাছ লাগাতে হবে। নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন বন্ধ এবং বৃক্ষ কর্তনের ওপর সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও ইটভাটায় কাঠ পোড়ানো সম্পূর্ণ রূপে নিষিদ্ধ করতে হবে। অবাধে পাহাড় কাটা, নদী ভরাট এবং বালু উত্তোলন রোধ ও আধুনিক প্রযুক্তির ইটভাটা স্থাপন করতে হবে। কাঠের ফার্নিচারের বিকল্প হিসেবে প্লাস্টিক, লোহা ও স্টিলের তৈরি ফার্নিচার ব্যবহার করতে হবে। খড়ির বিকল্প হিসেবে উন্নত চুলার ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমেই আমরা সুন্দর, সবুজ সমৃদ্ধ দেশ গড়ে তুলতে পারি। জাতীয় গণমাধ্যমগুলো এ ব্যাপারে প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখতে পারে। সবশেষে, বৃক্ষরোপণের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিবেচনায় এনে জাতীয়ভাবে কর্মসূচি গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

print