বাইডেনের বিজয় ও তুর্কি-মার্কিন সম্পর্ক

126
নজরুল ইসলাম ভুঁইয়া

নজরুল ইসলাম ভুঁইয়া

নতুন মার্কিন প্র্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছে জো বাইডেন। বাইডেনকে নিয়ে তুরস্কের উদ্বেগের যৌক্তিক কারণ আছে। বাইডেন প্রশাসন তুরস্কে আরো বেশি বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করবে; সরকার বিরোধী আন্দোলনও ফুঁসলিয়ে দিতে পারে। বাইডেন কয়েকমাস আগে তুরস্কের সরকার পরিবর্তনের জন্য আমেরিকার ‘সব ধরণের পন্থা’ অবলম্বন করার পরামর্শ দেন। যদিও ওবামা আমলে তুরস্ক-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে চিড় ধরেছিল। এর অন্যতম কারণ ছিল তুরস্কে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান এবং সিরিয়া ইস্যু। তুরস্কে ২০১৬ সালের রক্তক্ষয়ী ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পর এ সম্পর্ক তলানিতে। আমেরিকা প্রবাসী ফেতুল্লা গুলেনকে অভ্যুত্থানের খলনায়ক সাব্যস্ত করে তুরস্ক ওবামা প্রশাসনের কাছে তাকে ফেরত চায়। কিন্তু ওবামা প্রশাসন গুলেনকে ফেরত দেয় নি। অন্যদিকে সিরিয়ায় আরব বসন্তের সূচনায় তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করেছে। কিন্তু আইএস আবির্ভূত হলে আমেরিকা কুর্দিদের ব্যবহার করে। অন্যদিকে তুরস্কের দৃষ্টিতে কুর্দি সশস্ত্র দল পিকেকে সন্ত্রাসী দল হিসেবে বিবেচিত। ট্রাম্প আমলে তুরস্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কিছুটা উন্নত হয়। তাই উত্তর সিরিয়ায় পিকেকে বিরোধী তুর্কি অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র বাধা দেয় নি। আয়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তর এবং নাগার্নো-কারাবাখের যুদ্ধে প্রকাশ্যে আজারবাইজানকে সমর্থন ও ভূমধ্যসাগরে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ নিয়ে গ্রিসের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ায় বাইডেন তুরস্কের সমালোচনা করেছেন। রাশিয়ায় নির্মিত এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনা নিয়েও তুরস্ক-যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্ব। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে তুরস্ক এস-৪০০ চালু করলে আমেরিকা অবশ্যই আঙ্কারার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে। তবে একটা ন্যাটো সদস্যের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে বাইডেন সরকার অবশ্যই আগপিছ ভেবেই সামনে আগাবেন। তুরস্ক সীমান্তে রাশিয়া, চীন এবং ইরানের বিরুদ্ধে সুরক্ষা প্রাচীরের মত কাজ করে। এধরনের একটি নিষেধাজ্ঞা তুরস্ককে রাশিয়া-চীন-ইরান অক্ষয়ের কাছাকাছি নিয়ে যাবে। তাতে ন্যাটোর ক্ষতিই বেশি হবে। তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো সদস্য দেশ হওয়া সত্যেও তুরস্কের সার্বভৌমত্ব, ঐক্য ও অখণ্ডতার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেয়া পদক্ষেপ আঙ্কারাকে ভাবিয়ে তুলছে। এজন্য তুরস্ক সিরিয়া এবং ইরাকে সামরিক অভিযান চালিয়ে পিকেকে তথা আমেরিকার এই কৌশল নস্যাৎ করে দিয়েছে। কিন্তু পেন্টাগন এবং বাইডেন প্রশাসন কুর্দিদের নিয়ে তুরস্কের বিরুদ্ধে নতুন করে খেলবেন। সিরিয়াতে পিকেকে বেশি শক্তিশালী হলে বাসার আল আসাদ সরকারের জন্যও হুমকি। তাই তুরস্ক আসাদের সঙ্গেও সমঝোতা করতে পারে। তুরস্ক নিজেকে সিরিয়া, ইরাক, আজারবাইজান, সোমালিয়া, কাতার এবং লিবিয়ায় এমন শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেছে যে তাদের অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে তুরস্কের উপস্থিতি মাথায় রাখতে হবে। বাইডেন ক্ষমতায় বসে সাংবাদিক জামাল খাশোগী হত্যা, ইয়েমেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সৌদিকে চাপে রাখবেন যা পরোক্ষভাবে তুরস্কের অনুকূলে একটি পদক্ষেপ। সৌদি আরব খাশোগি ইস্যুতে পার পেতে চাইলে তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাইবেন। আর্মেনিয়ার বিরুদ্ধে আজারবাইজানকে আন্তর্জাতিক লবি এবং অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করার ক্ষেত্রে তুরস্ক এবং ইসরাইল একই পক্ষের হয়ে কাজ করছে। বাইডেনকে এই বিষয়গুলো অবশ্যই ভেবে কাজ করতে হবে। পরিশেষে, তুরস্ক তার ভ’-রাজনৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিমত্তার কারণে একদিকে যেমন বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে অন্যদিকে বিশ্ব মোড়লদের মাথা ব্যাথারও কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরদোগান যেভাবে স্বাধীনতার পাশাপাশি বহির্মুখীতা চর্চা করে ইউরোপ-এশিয়ায় বিস্তৃৃত একটি দেশ শাসন করছেন তা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে মেনে নেয়া কষ্টকর। সুতরাং বাইডেন সরকারের সঙ্গে তুরস্ককে নতুন নতুন কৌশল ও পরিকল্পনা নিয়ে সামনে আগাতে হবে। এখানে ছোট্ট একটি ভুল হলেই ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। আগামী কয়েকমাসের মধ্যেই আসলে বুঝা যাবে বিশ্ব রাজনীতির নানা গতি প্রকৃতি। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর বাইডেন হয়ত প্রকাশ্যে পূর্বের ভাষায় কথা বলবেন না। কিন্তু এরদোগান যেভাবে বিশ^ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করছে তার লাগাম টেনে ধরার জন্য বাইডেন যে তার পররাষ্ট্র এজেন্ডায় এরদোগানকে ঘিরে ফেলার পরিকল্পনা করবেন।

নজরুল ইসলাম ভুঁইয়া
সাবেক শিক্ষার্থী
রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

print