মৃত্যুদন্ড কি বাঁচাতে পারবে ধর্ষিত বাংলাদেশকে

74
কলাম

আলী আকবার

সাম্প্রতিক কালে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসাবে মৃত্যুদন্ডের বিধান রেখে একটি আইন পাশ করেছে সরকার। এতে কি ধর্ষণ বন্ধ হবে? ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলনের গতি বাড়তে না বাড়তেই এক রকম তড়িঘড়ি করে এ আইন পাশ হয়ে গেল; যেন এটাই চাইছিল সরকার। হঠাৎ করেই দলীয় কর্মীদের আকাক্সক্ষার বিপরিতে এ আইন পাশ করা নিশ্চয় সহজ কাজ নয়। তবে তড়িঘড়ি করে এ আইন পাশ করার পেছনে অন্য কোন কারণ নেইতো? এর আগেও সরকার তড়িঘড়ি করে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’ নামক আইনটি পাশ করেছিল, কিন্তু নারী ও শিশু নির্যাতন কি বন্ধ হয়েছে? বরং এ আইনের জন্মলগ্ন হতেই এর অনেক অপপ্রয়োগ হয়ে আসছে।

দৈনিক কালের কন্ঠ ১৭ই মে ২০১০ ‘আইনের ফাকে আইন’ শিরোনামের সংবাদে প্রকাশ জনৈক ৭০ বছরের বৃদ্ধ আবদুল মালেকের হৃদয় ছেড়া আর্তনাদ “মাননীয় আদালত আর কতদিন?” কিন্তু বিজ্ঞ আদালত নিরুত্তর। হয়তো বিচারকের কানে প্রবেশ করে নাই ঐ আর্তনাদ। গত বছরের (২০০৯ সালের) ৬ই মার্চের ঘটনা, সংবাদ বিবরনিতে প্রকাশ ৮ বছর যাবত চলছে ঢাকার আদালতে এই বিচার কার্যক্রম। বৃদ্ধ জেল খেটেছেন ৩ বছর। আবদুল মালেকের বয়স এখন ৭০, কানে কম শোনেন। মামলার বিবরনিতে বাদিনীর বোনকে এসিডে মুখ ঝলসে দেয়া হলেও, তদন্ত কর্মকর্তার রিপোর্টে মুখ এসিডে ঝলসানোর কোন আলামত কিংবা ডাক্তারি সনদ নাই। এতে কি প্রমাণিত হয়না মামলাটি প্রতিহিংসামূলক এবং মিথ্যা? এ জাতীয় মামলা ১৮০ কার্য্য দিবসে বিচার শেষ হতে হবে এটা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারেরই আইনী নির্দেশনা কিন্তু উক্ত বিচার শেষ হয় নাই। এ আইনে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে আবদুল মালেকের মতো অসংখ্য মানুষকে। এবং এখনও হতে হচ্ছে।

ধর্ষণ কি শুধু পুরুষই করে? ধর্ষক যে নারীও হতে পারে এমন প্রমানও আছে ভুরিভুরি। ২০০৭ সালে আমেরিকায় এক পিতা আদালতে মামলা করেন, তার ১৪ বৎসরের ছেলে স্কুল শিক্ষিকা কর্তৃক ধর্ষিত হয়েছে এবং ওই শিক্ষিকা যথারিতি অন্তঃসত্ত্বাও হয়েছে। আদালত সুস্পষ্ট প্রমানের প্রেক্ষিতে সাজা প্রদান করেন। নারী ধর্ষিত হলেই শোরগোল পরে যায় অন্যদিকে একজন পুরুষ তার ধর্ষিত হওয়ার কাহিনী চেপে যায়। কারণ পুরুষের নাকি পৌরষত্বে আঘাত আসে।

বহুদেশে মৃত্যুদন্ড বলে কোন আইন নেই। মৃত্যুদন্ড দিয়ে কোন অপরাধের বিচার হতে পারে না। যে কোন অপরাধের বিচার করা মনেই হলো অপরাধীকে সংশোধন হওয়ার সুযোগ দেয়া এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রে নজির সৃষ্টি করা। আর তাই যদি হয় তবে একজন ধর্ষককে মৃত্যুদন্ড দিলে একদিকে সেই অপরাধী যেমন সংশোধনের সুযোগ বঞ্চিত হলো অন্যদিকে সমাজে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘমেয়াদী কোন প্রভাবও তৈরী হলোনা। অর্থাৎ একজন ধর্ষককে আমরা মৃত্যুদন্ড দিলাম তো আমরা উক্ত ঘটনার মধ্যেই থেমে গেলাম। এতে সমাজ বা রাষ্ট্র কতটুকু লাভবান হচ্ছে, তাও নিশ্চয় নতুন করে ভাবার বিষয়।

ধর্ষণ বিপরিত লিঙ্গের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হিংসাত্মক বা আক্রমনাত্মক ভাবে জোর জবরদস্তি যৌন হয়রানি করা। মানুষ জন্মগতভাবেই বহুগামী প্রজাতির, আরতাই অনিবার্য ভাবেই তার মধ্যে বহুগামীতা থাকবেই। জৈবিক চাহিদা প্রতিটা জীবেই অনিবার্যভাবে বিদ্যমান। এই জৈবিক চাহিদা চরিতার্থে পশু ও মানুষের মধ্যে কিছুটা ভিন্নতা দেখা যায়। পশু যেনতেন ভাবে তার যৌন চাহিদা পুরণ করে আর মানুষ করে মনের মাধুরী মিশিয়ে। ক্ষুধা পেলে কুকুর কাঁচা কি সিদ্ধ তার কোন বাছবিচার করেনা কিন্তু মানুষ রান্না করে সাজিয়ে গুছিয়ে মনের আনন্দ মিলিয়ে খায়। এই মানুষ আর পশুতে পার্থক্য হলো কিছু শারীরিক যৌগিক উপাদানে সংখ্যাগত তারতম্য। মহামতি কার্ল মার্কস তার ঐতিহাসিক দন্দমূলক বস্তুবাদ বিষয়ক রচনায় উল্লেখ্য করেছেন সংখ্যাগত তারতম্যের কারণে গুনগত পার্থক্য তৈরী হয়। উদাহরণ স্বরূপ পানির মলিকুল সাইন H2O। এখানে হাইড্রোজেন অক্সিজেনের দ্বিগুন। আমরা যদি হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন এর সংখ্যা পরিবর্তন করে অক্সিজেন হাইড্রোজেনের দ্বিগুন করি তবে তা দিয়ে অবশ্যই আগুন জ্বালানো সম্ভব। এখানে মূল কারণ বস্তুর অভ্যন্তরের সংখ্যাগত তারতম্য।

যেকোন ঘটনার পেছনে একটা কারণ থাকে, আবার প্রতেকটা কারণের পেছনেও একটা কার্যকারণ থাকে। যেকোন ঘটনার কারণ নির্নয় করা নিশ্চয় অবশ্যক। এ ব্যপারে চীন বিপ্লবের মহানায়ক মাওসেতুং এর একটি কথা অনেক বেশী প্রণিধান যোগ্য। তিনি বলেছিলেন, শিকড়ের সন্ধানে যাও; শিকড়ে পুষ্টি যোগাও। আমরা যদি ধর্ষণের মত অপরাধের কারণ এবং কার্যকারণ না নির্নয় করে হঠাৎ কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাই তবে নিশ্চিত সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া হবেনা। অনেকটা রোগ না বুঝে ঔষধ দেয়ার মতো হবে। ধর্ষণের মত জঘন্য অপরাধের অনেক কারণ থাকতে পারে।

সর্বজন বিবেচিত যে, পৃথিবীর সকল প্রাণীই মস্তিস্ক দ্বারা পরিচালিত হয়। মস্তিস্কে অসংখ্য কোষ রয়েছে এই কোষ সময় মতো সংকেত দেয় এবং মানুষ তা অনিবার্যভাবে অবশ্যই পালন করে থাকে। মশা মানুষের শরীরের যে অংশে আক্রমন করবে মানুষের হাতও সেখানেই প্রতিহত করবে, এটাই মস্তিস্কের সিগন্যাল। ঠিক তেমনি মানুষ অপরাধও করে মস্তিস্কের সিগন্যালে। বৈজ্ঞানিক মতে মস্তিস্কে পি নামক কোষ বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ করে, পি কোষ নারী পুরুষ উভয়ের মাঝে বিদ্যমান, সমযোগ্যতা সম্পন্ন ও সমপরিমান পি কোষ একে অপরকে আকর্ষণ করবে। প্রাণী কুলেও এ আকর্ষণ বিদ্যমান। মিলনের প্রয়োজনে পরষ্পর পরষ্পরকে বিভিন্ন ভাবে আকর্ষন করে এবং মিলিত হয়। দার্শনিক এরিখ ফার্ম তার ‘দি আর্টস অব লাভিং’ গ্রন্থে এই পি কোষকে অর্থনৈতিক অবস্থান থেকে বিশ্লেষন করেছেন। অর্থনৈতিক অবস্থান শক্তি ও ক্ষমতার অবস্থান নির্নয় করে। আর তাই তিনি দেখিয়েছেন, রূপকথার গল্পে রাজকন্যা রাখালের হাত ধরে রাজ্য ছেড়ে পালালেও বাস্তবে এমন দৃশ্য কল্পনাও করা যায়না। অর্থনৈতিক অবস্থান সমপর্যায়ে নাহলে পরষ্পরের মধ্যে ‘প্রেম কিংবা ভালোবাসার’ আকর্ষণ তৈরী হলেও সেটা হয় নিতান্তই শরীর নির্ভর।

আধুনিক দর্শন শাস্ত্রের জনক দেকার্ত বলেছেন ‘কোন কিছুকে ক্ষন্ডিত ভাবে বিশ্লেষন করলে ঐ বস্তুর মৌলিকত্ব স¤পর্কে অজ্ঞই থেকে যেতে হয়’। অতএব যে কোন বিষয়ের সঠিকতা নিরুপনে কোন ভাবেই ক্ষন্ডিত নয় পূর্নাঙ্গ বিশ্লেষণ অত্যাবশ্যকিয়।

আমরা প্রচলিত ও গতানুগতিক চিন্তার ফ্রেমে বাধা পরে গেছি। কোন কিছুকেই আমরা নতুন ভাবে ভাবতে চাই না, কিংবা ভাবতেও পারি না। যে কোন ঘটনা শুধু একটি কারণে নয়; ঘটতে পারে হাজারো কারণে। কাক মানেই কালো, সাদা কি হতে পারেনা?

বৈজ্ঞানিক মতে মানব মস্তিস্ক অসংখ্য কোষের সমাহার। আর এই মস্তিস্কের যে কোষগুলো যখন সক্রিয় হয় মানুষ তখন সেই কোষগুলো কর্তৃক নির্দেশিত কাজটাই করে। যখন মানুষের যৌন অনুভূতির কোষগুলি শুড়শুড়ি পায় তখন মানুষ যৌনাকাংখা বাস্তবায়নে সক্রিয় হয়ে উঠে। সমাজ কি যৌনতার শুড়শুড়ি দেয় না? নারী স্বাধীনতার মানে কি অশ্লীল দেহ প্রদর্শন, নারী স্বাধীনতা মানে কি কেবলই যৌন আবেদনময়ী বিজ্ঞাপন? নারীর আকর্ষণ কতটুকু তা আমরা ট্রয় নগরীর হেলেনের কাহিনীতে জানি বা ফেরেস্তা হারুৎ মারুতের চরিত্র হননের কারণ জোহরা নামক নারী। যা প্রায় সবারই জানা। ইতালিয় কোক শাস্ত্র বা ভারতীয় কামসূত্র নারী স্বাধীনতার প্রতিক নয় এটাই অনেক নারীবাদী নেতানেত্রী মানতে পারেন না। প্রাকৃতিক ভাবেই নারী-পুরুষের সীমা নির্ধারণ করা রয়েছে, ধারণ ক্ষমতার বেশী ওজন নিলে যেমন জাহাজের ভরাডুবি হয় ঠিক তেমনটাই মানুষের বেলায়, মহা ভারতেও বলা আছে ‘প্রয়োজনের অতিরিক্ত আলো মানুষকে অন্ধ করে দেয়’। আর তাই সামগ্রীক সত্যা সত্য বিচারে নতুন করে ভাবতে হবে, ভাবনার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে, কোন নির্দিষ্ট চিন্তার ফ্রেমে আটকে থেকে নয় ফ্রেমের বাইরে এসে ভাবতে হবে।

বর্তমানকালে দেশ জুড়ে সংগঠিত ধর্ষণের মূল কারণ হলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার আর কার্যকারণ হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। এযাবত যতগুলো উলেখ্যযোগ্য ঘটনা সংগঠিত হয়েছে তার প্রায় সবগুলো অপরাধী পার পেয়ে গেছে ক্ষমতার দাপটে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়। বিচারের দীর্ঘসুত্রিতা বিচার না হওয়ার নামান্তর। বিচারের এই দীর্ঘ পরিক্রমা বা জটিলতার কারণে মানুষ পুলিশ এর কাছে যায় না। মানুষ যায় স্থানীয় মাস্তান পান্ডা সন্ত্রাসীর কাছে। এরা কি কখনো ন্যায় বিচারক হতে পারে?

কেবল নতুন নতুন আইন করলেই অপরাধ নির্মূল হবেনা যদি না তার সঠিক প্রয়োগ করা হয়। ঔষধ কিনে সেবন না করে যত্ন করে লকারে রাখলে রোগ সারবে না, উপযুক্ত চিকিৎসকের পরামর্শে নিশ্চয় সে ঔষধ সেবন করতে হবে। ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদন্ড করা হয়েছে কিন্তু দুখঃজনক হলেও সত্য এতে ধর্ষণ বন্ধ হবেনা। যত দিন না ধর্ষণের কারণ চিহ্নিত করে এর উৎপত্তি স্থল বন্ধ করা যায়?

print