যুবলীগের পদ পেতে নেতাদের ইট উপহার

387
বাঁ থেকে কামাল, দুলাল, সবুজ, নীচে কামালের অবৈধ ভবন

মতলব উত্তর ৩নং সাদুল্যাপুর ইউনিয়ন যুবলীগ কমিটিতে

মতলব প্রতিনিধি
বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারন সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলের নেতৃত্বে সারাদেশেই যুবলীগের কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন দলে আধিপত্য বিস্তার করা নেতাদের সরিয়ে নতুন ও যোগ্যদের কমিটিতে স্থান দিতে দলীয় নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। তারই ধারাবাহিকতায় গেল বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তরে ৩নং সাদুল্যাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী যুবলীগের একটি কর্মীসভা অনুষ্ঠিত হয়। যাতে অংশ নেন যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিসহ, জেলা, থানা ও ইউনিয়ন কমিটির সাবেক ও বর্তমান নেতারা। নতুন কমিটিতে সভাপতি পদ পেতে প্রার্থী হিসেবে আবেদন করেন ১৪ জন আর সাধারন সম্পাদক পদে প্রার্থী হয়েছেন ৮ জন। সভাপতি প্রার্থী হিসেবে পদুয়ারপারের সফিকুল ইসলাম মিয়াজী ও দেলোয়ার হোসেন দুলাল, বদরপুরের সাইফুল ইসলাম আকতার ঢালী ও লেনিন খান, পুটিয়াপারের মফিজ উদ্দিন মোল্লা স্বপন, ফারুক গাজি ও শাহাদাত হোসেন মাসুদ, শ্যামনগরের রাশেদ মেম্বার ও খালেদ প্রধান, মুক্তিরকান্দির দীন ইসলাম, শরিফ সরকার ও আবু সালেহ মুরাদ, জামালপুরের জিশান আহমেদ, সাদুল্যাপুরের স্বপন। সাধারন সম্পাদক পদ পেতে মরিয়া হয়ে ইতিমধ্যে দৌঁড়ঝাপ শুরু করেছেন নেতারা। অভিযোগ আছে কমিটি গঠনে স্থানীয় দায়িত্বপ্রাপ্তদের কয়েকজনের সঙ্গে গোপনে আঁতাতের চেষ্টা করছেন বেশ ক’জন সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক প্রার্থী।
গুরুতর অভিযোগ আছে পদুয়ারপারের দেলোয়ার হোসেন দুলালের বিরুদ্ধে। যিনি দলে অনুপ্রবেশকারী ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শোক দিবসে ২০০২ সালের ১৫ আগস্টের অনুষ্ঠানে ভাংচুর করেন। যা নিয়ে ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় ওঠেছে।

সূত্র জানান, দুলাল ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত স্থানীয় বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম সিআইডির নেতৃত্বে ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলো। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সে বিএনপি থেকে সরকারি দলে নাম লেখান। বর্তমানে তিনি ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি হয়ে আওয়ামী লীগ কর্মীদের সেবা করতে চান।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি ২০০২ সালে থানা কমিটিতে যুগ্ম সম্পাদক ছিলাম। আমার গ্রামের সভাপতি প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মিয়াজী পারিবারিক শত্রুতার জেরে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।

সাধারন সম্পাদক পদের ৮ প্রার্থীর মধ্যে ৪ জনের বিরুদ্ধেই রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। সবচেয়ে বেশি সমালোচনার শীর্ষে আছেন গোপালকান্দির কামাল হোসেন। যার বাবা বিএনপি সমর্থিত সাবেক ইউপি সদস্য মনির মেম্বার। এ বছরের ১১ জুন (বৃহস্পতিবার) বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় সাদুল্যাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি শাজাহান সরকার ও মনির মেম্বারের মধ্যে এলাকায় বিদ্যুত সংযোগের নামে কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে সংবাদ প্রকাশ হয়। যাতে মনির মেম্বার ও শাজাহান সরকার টাকা আত্মসাতের বিষয়ে একে অপরকে দোষারোপ করেন। বিএনপি নেতা মনির মেম্বারের ছেলে কামালই এখন যুবলীগের সাধারন সম্পাদক প্রার্থী। কামালের বিরুদ্ধে জাল দলিল তৈরি করে গোপালকান্দি গ্রামের একটি প্রবাসী পরিবারের সদস্যদের জমিতে দীর্ঘ ১০ বছর যাবত ইটভাটা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। ওই জমির ১৫ জন মালিকের মধ্যে মাত্র ৪ জনের স্বাক্ষর রয়েছে দলিলে। বাকিদের কোন স্বাক্ষর নেই। মেঘনা ধনাগোদা নদীর তীরে মনির ব্রিকস নামক ইটভাটার আশপাশের বহু নিরীহ কৃষকদের জমিসহ, নদীর বেশ কিছু অংশ দখল করেছে সে। রাতের আধারে মাটি কেটে বিলীন করা, কৃষকদের জমি দখল করা, নদী দখল করে ব্যবহার করা তার অর্থ উপার্জনের মূলমন্ত্র। সম্প্রতি একজন মুক্তিযোদ্ধার জমির মাটিও কেটে নেয় কামাল। এ নিয়ে জেলা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেন ওই মুক্তিযোদ্ধা। তবে অর্থের জোর ও যুবলীগের নাম ব্যবহারের কারনে কোন প্রতিকার পান নি ওই বীর মুক্তিযোদ্ধা। প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দেয়ায় কামালের ছোট ভাই চিহ্নিত ইয়াবা ব্যবসায়ী শরিফ মুক্তিযোদ্ধার দুই ভাতিজাকে বাড়ি থেকে ধরে এনে ছুরিকাঘাতে রক্তাক্ত করে। রক্তাক্ত অবস্থা থানায় অভিযোগ করতে গেলে মামলা নেয়া তো দূরের কথা তাদের কোন কথাই শোনেন নি তৎকালীন ওসি কবির হোসেন। কামালের ভাই শরিফের নামে এখনো মতলব উত্তর থানায় চারটি মাদক মামলা চলমান আছে। এরই মধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গা দখল করে দিনে দুপুরে ইয়াবা সেবনের আস্তানা বানালেও কোন বাধা দেয় না প্রশাসন। অবৈধ ইটভাটা দিয়েই কামাল এখন কোটি টাকার মালিক। এমন জঘন্য কর্মকান্ড চললেও স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড এমনকি স্থানীয় গন্যমান্য ব্যক্তিদের কাছে নালিশ গেলেও কোন প্রতিকার পায় না এলাকাবাসী।

বেশ কজন এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কামালকে সহযোগিতা করছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা শাজাহান সরকার। নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে রাস্তা নির্মানের অন্যতম হোতা ঠিকাদার আলমগীর, যুবলীগের থানা কমিটির সভাপতি দেওয়ান জহির যিনি ইতিমধ্যে কামালকে সাধারন সম্পাদক বানিয়ে দেয়ার প্রলোভনে ১০ হাজার ইট নিয়েছেন। যুবলীগ সাধারন সম্পাদক কাজী শরীফ যিনি গেল ২৪ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) কর্মীসভায় উৎকোচ হিসেবে কামালের কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকাও নেন। পাশাপাশি প্রতি প্রার্থীর কাছ থেকে ২ হাজার করে টাকাও নেন কাজী শরিফ ও জহির। সঙ্গে যোগ দিয়েছেন থানা কমিটির আরেক সদস্য তাহের যার বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা রয়েছে। ওই কুচক্রীমহলই ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিএনপি পরিবারের কামালকে সাধারন সম্পাদক বানাতে চায়। এমনকি বর্তমান সভাপতি দেওয়ান জহির ও সাধারন সম্পাদক কাজী শরীফ উৎকোচের বিনিময়ে কামালকে রাতের আঁধারে পদ ঘোষণা দেয়ার অপচেষ্টা চালিয়েছেন। যা যুবলীগের কেন্দ্রিয় নেতাগনের উপস্থিতির কারনে ভন্ডুল হয়ে যায়।

এতসব অভিযোগ নিয়ে কামালের সঙ্গে কথা বললে কামাল জানান, যে অভিযোগ করছে তারে প্রশ্ন করেন। আমারে প্রশ্ন করেন কেন? আমি নির্বাচিত হলে পরে দেখা যাবে কার জন্য কী করবো। সারা দেশের দায়িত্ব আমার না। আমি খুব ব্যস্ত। আপনার সাথে কথা বলার ইচ্ছে আমার নেই।

কামালের কাছ থেকে ১০ হাজার ইট উপহার নেয়ার বিষয়ে মতলব উত্তর থানা যুবলীগের সভাপতি দেওয়ান জহির বলেন, এ বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও অবান্তর। আমি দীর্ঘদিন যুবলীগের রাজনীতি করছি। মানুষ আমার সম্পর্কে জানে। আমার ঢাকা শহরে জায়গা নেই, গাড়ি নেই, বাড়ি নেই।

কমিটি গঠনের জন্য প্রত্যেক প্রার্থীর কাছ থেকে ২ হাজার টাকা চাঁদা নেয়ার বিষয়ে থানা কমিটির সদস্য তাহের বলেন, সবাই তো টাকা দেয় নাই। ৬ জন প্রার্থী ১২ হাজার টাকা দিছে। ওই টাকা দিয়ে প্যান্ডেল খরচ দিয়েছি। বাকি প্রার্থীরা টাকা দেয় নাই। দরকার হয় নাই তাই আমাদের ফান্ডের টাকা খরচ করি নাই।

কামালের কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকা উপহার নেয়ার বিষয়ে মতলব উত্তর থানা যুবলীগের সাধারন সম্পাদক কাজী শরীফ বলেন, কাজী শরীফের কাছে এগুলো চলে না। আমি কারো কাছ থেকে ১ কাপ চাও খাই না। বিষয়টি মিথ্যা।

আরেক প্রার্থী মোস্তফাপুরের হারুন রশিদ সবুজ। যিনি ২০০২ সালে বিএনপির হয়ে আওয়মী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর সন্ত্রাসী হামলাসহ ১৫ আগস্টের অনুষ্ঠানে ভাংচুর চালান। অভিযোগের বিষয়ে সবুজ বলেন, ওই সময় আমি সৌদিতে ছিলাম। এই অভিযোগ সত্য নয়।

প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালীকে (খোকন ঢালী) ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো গাজির গাছতলার কামরুল পাঠানও। বিষয়টি ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

এ বিষয়ে কামরুল বলেন, আতাউর রহমান ঢালী আমার বোনের জামাই। আত্মীয় হিসেবে তাকে ফুল দিয়েছি। আমার ইউনিয়নে হারুন রশীদ সবুজ ও দেলোয়ার হোসেন দুলাল আওয়ামী লীগের সমাবেশে হামলা করেছে। তারাও প্রার্থী হয়েছে। এছাড়াও ভূমি দখলকারী, মুক্তিযোদ্ধার উপর হামলাকারী, মাদক ব্যবসায়ীর ভাই, বিএনপি নেতার ছেলে কামালও প্রার্থী হয়েছে।

এতসব অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে তার কীভাবে আওয়ামী যুবলীগের মতো এমন ঐতিহ্যবাহী সংগঠনে প্রার্থী হবার সুযোগ পেলেন জানতে চাইলে মতলব উত্তর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান মোতাহার হোসেন খান সুফল বলেন, মতলব দক্ষিন যুবলীগের আহবায়ক ও যুগ্ম আহবায়ককে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। মতলব উত্তরে যারা প্রার্থী হচ্ছে তাদের সিভি নেয়া হচ্ছে, তদন্ত করা হচ্ছে, যাচাই বাছাই করা হচ্ছে। জননেত্রী শেখ হাসিনার নীতিনির্ধারক যারা আছেন তাদের কথা হলো অনুপ্রবেশকারী, মাদক ব্যবসায়ী ও নানা অপকর্মে জড়িতরা জানা স্বত্ত্বে দলে ঢুকতে পারবে না। যদি কোন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ঢুকে যায় তবে তাৎক্ষনিকভাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমরা চাচ্ছি যুবলীগ ফ্রেস এবং ফেয়ার থাকবে। আমার পরিষদ থেকে আমি, আমার চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য মহোদয় চেষ্টা করছি অতীতে অভিযুক্ত যারা ছিলেন ওই রাহুগ্রাস থেকে মতলবকে উদ্ধার করতে। আপাতত আমরা ৬০ শতাংশ সফল।

জেলা কমিটির আহ্বায়ক কালু ভুইয়া জানান, এই কথাগুলো আমাদের দলের হাইকমান্ডের কথা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার উক্তি হচ্ছে অনুপ্রবেশকারীমুক্ত, মাদকমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত, বিশৃঙ্খলাকারীমুক্ত আওয়ামী লীগ হবে। যুবলীগের চেয়ারম্যান ও সাধারন সম্পাদক আমাদেরকে মাঠপর্যায়ে এই ম্যাসেজ দিয়েছেন। আমরা তৃণমূলে সম্মেলন করতে গিয়ে সকলকে এই ম্যাসেজ দিচ্ছি। এই বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আমরা মাঠপর্যায়ের সবগুলো কমিটি করতে পারি নি। আমরা সিভি নিচ্ছি জানার জন্য। সে আগে কোন দল করতো। তার পরিবারের সদস্যগন কোন দলের সাথে জড়িত ছিলো বা আছে। মাদকের সাথে সম্পৃক্ত কিনা সেটা আমরা স্থানীয় পর্যায়ে যাচাই বাছাই করছি। এই বিষয়গুলোকে সামনে নিয়ে কাজ শুরু করেছি। একটা ক্ষমতাসীন দলে বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন ছত্রছায়ায়, বিভিন্ন কারনেই কিছু লোক ঢুকে আছে। এই লোকগুলোকেই কিছু লোক পেট্রোনাইজ করে। তাদের নিজেদের আখের গুছানোর জন্যই এই কাজ তারা করে। তাছাড়া সংগঠনের মধ্যে নিজেদের প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তারের জন্য করে। ওই সমস্ত অভিযুক্তদের আমাদের লোকেরাও সুযোগ বা সাইড দেয়। তবে আমরা সাংগঠনিকভাবে দুর্বল না। দলের হাইকমান্ডের কথা বাস্তবায়ন করতে আমরা আশাকরি সহযোগীতা পাবো। হাইকমান্ডের সহযোগীতা পেলেই আমরা সফলকাম হতে পারবো। অভিযুক্তরা প্রবেশ করলে দলের কী ক্ষতি হবে এ বিষয়ে তিনি বলেন, ক্ষতিটা তখনই বোঝা যাবে, যখন দল বিরোধী দলে যাবে। এখন তো বোঝা যাবে না। এখন তো জোয়ার আছে। জোয়ারের সাথে একদম কী ঢুকতেছে সেটা দেখা যাচ্ছে না। যখন ভাটা লাগবে তখন বোঝা যাবে জোয়ারের সাথে কী কী ঢুকছে। স্থানীয় পর্যায়ে দলের হাইকমান্ডের আস্থাভাজন লোক আছে। আমাদের লোক আছে। তাদের দিয়ে পর্যালোচনা করে কমিটি অনুমোদন দিলে অভিযুক্ত কেউ আসতে পারবে না।

print