রাজনীতি ও নারী নেতৃত্ব

122
নজরুল ইসলাম ভুঁইয়া

নজরুল ইসলাম ভুঁইয়া

দেশের চলমান উন্নয়ন কর্মকান্ডে গতিশীলতায় নারীর ক্ষমতায়ন ও দক্ষতা উন্নয়ন অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৫৪’র নির্বাচন, ৬৬’র ছয়দফা আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীর সরাসরি অংশগ্রহন অবিস্মরণীয়। মা-বোনদের মহান আত্মত্যাগ না থাকলে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় হয়তো বিলম্বিত হত। স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে নারী নেতৃত্বের ভূমিকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। বেগম খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আন্দোলনের ফলে স্বৈরাচার এরশাদের পতন হয়। ১৯৯১ সাল থেকে দেশ নারী নেতৃত্বের অধীন। প্রধানমন্ত্রী, সংসদে বিরোধী দলের নেতা, স্পিকার, রাজপথের বিরোধী দলের নেতা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, কৃষিমন্ত্রী, সচিব, উপাচার্য, পর্বতারোহী, বিজিএমইএ সভাপাত, মেজর পদে নারী নেতৃত্ব চলে এসেছে। পৃথিবীতে এমন ঘটনা বিরল। কিন্তু নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতা বলতে যা বোঝায়, তা অনুপস্থিত। ১৯৮৬ সালে আমাদের সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন ছিল ৩০টি, বর্তমানে বেড়ে হয়েছে মাত্র ৫০টি। নারী নেতৃত্বের দেশে নারীরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে অনেক পিছিয়ে আছে। তারা পিছিয়ে আছে চাকরি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যেও। শিক্ষাঙ্গনে নারী প্রায় সমান হলেও কর্মক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ অনেক কম। একমাত্র গার্মেন্টস খাতেই নারীর অংশগ্রহণ পুরুষের চেয়ে বেশি। সরকার বা রাজনৈতিক দলের প্রধান নারী হলেই নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন হয়েছে বলা যায় না। রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন হয়নি, হয়েছে উত্তরাধিকারের। যেদিন নারী ঘরে-বাইরে লাঞ্ছনা ও নিগ্রহের শিকার হবে না, সংরক্ষিত আসনের তকমা নিয়ে তাকে সংসদে ঢুকতে হবে না এবং সর্বত্র নারী স্বাধীনভাবে চলতে পারবে সেদিনই নারীর ক্ষমতায়ন হবে। দুটি প্রধান দলের শীর্ষ পদে নারী নেতৃত্ব থাকার পরও আমাদের রাজনেতিক কাঠামো নারীর ক্ষমতায়নে সহায়ক নয়। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাও তাদের রাজনীতিতে আসার পথে বাধা। স্বাধীনতার ৫০ বছরেও আমরা এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে পারিনি, যাতে নারীরা নির্বিঘ্নে নেতৃত্বে আসতে পারেন। এখনও দলীয় রাজনীতি পেশিনির্ভর। নারীর কালো টাকাও নেই, মাস্তান বাহিনীও নেই, ফলে ক্ষমতাকেন্দ্রিক দলগুলি নারীকে নমিনেশন দেয় না। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক বাধার সঙ্গে নির্বাচন প্রক্রিয়াও নারী নেতৃত্ব তৈরিতে বিরাট বাধা। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে গনতন্ত্রচর্চা বাড়াতে পারলে তৃণমূল থেকে নারী নেতৃত্ব গড়ে তোলা সম্ভব। নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত করতে না পারলে এবং নারী নির্যাতন বন্ধ করে, নারীর নিরাপত্তা দিতে না পারলে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো যাবে না। তাই সরকারকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী, রাজনীতিতে নিয়ে এসে রাষ্ট্রের উন্নয়নে তাদের মেধা, প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বকে কাজে লাগাতে হবে। শ্রেণি ও লিঙ্গ বৈষম্যের ফলে নারীরা আজও সর্বক্ষেত্রে পিছিয়ে। ফলে দৃশ্যমান রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ গৌণ। কোথাও নারী প্রধান ভূমিকায় নাই। সবক্ষেত্রে সে প্রান্তিক, দ্বিতীয় লিঙ্গ। বর্তমান রাজনীতিতে নারীর পদচারণা সরব হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়ায় তারা প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। বিশ^ব্যাপী নারী আজও পুরুষের মতো পরিপূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে না। বৈশি^কভাবে নারী নেতৃত্ব তৈরি হলেও এর পরিমাণ ও গুণগত অবস্থান পরিবর্তন হয়নি। নারীর জয়ে সবার জয় এই স্লোগানকে সামনে রেখে নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য পরিবার, রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে একসাথে কাজ করতে হবে। কোনো সীমাবদ্ধতা ছাড়া নারী যদি নিজেদের জীবনধারা পরিবর্তনের সকল সুযোগ-সুবিধা পায় তবেই নারীর ক্ষমতায়ন সম্ভব হবে। নারীর ক্ষমতায়নই হচ্ছে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের অন্যতম চাবিকাঠি। বাংলাদেশে নারীদের সম অধিকার সংবিধান স্বীকৃত। বর্তমানে ৩০ লাখেরও বেশি নারী শ্রমিক পোশাক শিল্পে কর্মরত আছেন। বিশ^ রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন অনেক নারী প্রধান। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ব্রিটিশরানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ, ডেনমার্কের রানি দ্বিতীয় মার্গারেট। এছাড়া ব্রিটেনের টেরেসা মে, ডেনমার্কের হেলে-থর্নিং-স্মিউট, বাংলাদেশের বেগম খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনা, জার্মানীর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল, শ্রীলংকার শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে, নেপালের বিদ্যাদেবী ভান্ডারি, ক্রোয়েশিয়ার কোলিন্ডা কিটারোভিচ, লিথুয়ানিয়ার দালিয়া গ্রিবাউসকেইট, মালটার মারি লুইস কলেইরো, নামিবিয়ার সারা কুগংগেলওয়া, মিয়ানমারের সু চি, নিউজিল্যান্ডের জেসিকা আর্ডান, আইসল্যান্ডের ক্যাট্রিন জ্যাকোবসডোটির, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের হিলডা হেইন, নরওয়ের আরনা সোলবার্গ, ব্রাজিলের দিলমা রুসেফ, চিলির মিশেল বাসিলেতকে, লাইবেরিয়ায় এলেন জনসন সারলিফ, কসোভোর আতিফাতে জাহাজাগা, দক্ষিণ কোরিয়ায় পার্ক জিউন-হাই, উত্তর সাইপ্রাসের সিবাল সিবার, লাটভিয়ার লাইমডোটা স্ট্রজুমা, পোল্যান্ডের ইওয়া কোপ্যাক, সুইজারল্যান্ডের সিমোনেট্টা সোমারুগা, এস্তোনিয়ার ক্রিস্টি কালজুয়েড মারিয়া সেদওয়া, আফ্রিকার লের জনসন সারলিফ, মরিশাসের আমিনাহ গুরিব-ফাকিম, জ্যামাইকার পোর্শিয়া সিম্পসন মিলার, ইথিওপিয়ার সাহলে ওয়ার্ক জেব্দে, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোর কামলা পারসেদ-বিসেসার, তাইওয়ানের সাই ইং ওয়েন, সিঙ্গাপুরের হালিমা ইয়াকুব, আর্জেন্টিনার ইসাবেল পেরন, ভারতের ইন্দিরা গান্ধী ও প্রতিভা পাতিল সহ বিশে^র বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্্র ও সরকার প্রধান হিসেবে নারীরা দায়িত্ব পালন করেছেন এবং করছেন। অদূর ভবিষ্যতে নারী নেতৃত্ব আরো শক্তিশালী করার লক্ষ্যে আমাদের কাজ করতে হবে, এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

নজরুল ইসলাম ভুঁইয়া
সাবেক শিক্ষার্থী
রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

print