রাজনীতি বিজ্ঞানের উজ্জ্বল নক্ষত্রের চিরবিদায়

118
নজরুল ইসলাম ভুঁইয়া

নজরুল ইসলাম ভুঁইয়া

প্রফেসর ড. এমাজ উদ্দিন আহমদ, সর্বজন শ্রদ্ধেয় খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ, ঢাবির সাবেক উপাচার্য, গবেষক-পর্যালোচক, লেখক এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, ১৯৩৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর তৎকালীন মালদহ, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত (চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও ভারতের কিছু অংশ) জেলায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগের পর চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের গোহাল বাড়ি এলাকায় পরিবারসহ দীর্ঘদিন বসবাস করেন। তার পিতা ছিলেন একজন শিক্ষক। মা গৃহিণী। ছাত্রজীবনে মেধাবী হিসেবে তার সুনাম ছিল। সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়বোধ ও নেতৃত্বের গুণাবলি ছিল তার। ১৯৪৮ সালে অবিভক্ত মালদার গোলাপগঞ্জ হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। তিনি শিবগঞ্জের আদিনা সরকারি ফজলুল হক কলেজ ও রাজশাহী কলেজের প্রাক্তন ছাত্র। রাজশাহী কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পাস করেন। স্নাতকে তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন। তিনি রাজশাহী কলেজ ছাত্র সংসদের সহসভাপতি নির্বাচিত হন। স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করার পর তিনি সরকারী কলেজের প্রভাষক হিসাবে সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেন। পরে কলেজের অধ্যক্ষ হন। মহান ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে, ১৯৫২ এর পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছাত্রনেতা হিসেবে কারা বরণও করেন। ১৯৫৪ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করেন। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি করেন। ড. এমাজ উদ্দীন আহমদ পিএইচডি করেন ১৯৭৭ সালে কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। আশির দশকে তিনি জার্মানির হাইডেলবার্গ ইউনিভার্সিটি ও যুক্তরাষ্ট্র্রের স্টেট কলেজ ইউনিভার্সিটিতে সিনিয়র ফেলো ছিলেন। ১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনিয়র লেকচারার হিসেবে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে যোগদান করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের খ্যাতনামা অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ চৌধুরীর আনকূল্যে তিনি যোগদানপত্র পান। ভালো বক্তা ও অধ্যয়ন পিপাসু ভালো শিক্ষক হিসেবে সহজেই প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় আড়াই দশক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল সায়েন্স ডিপার্টমেন্টে অধ্যাপনার পাশাপাশি পালন করেন অনেক প্রশাসনিক পদের দায়িত্বও।
একাধারে সহযোগী অধ্যাপক, অধ্যাপক ও বিভাগের চেয়ারম্যান, প্রক্টর, প্রভোস্ট, প্রো-ভিসি এবং সর্বশেষ ভিসি হিসেবে ১ নভেম্বর ১৯৯২ থেকে ৩১ আগস্ট ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সাফল্যের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ছয় বছরের কর্মবিরতি শেষে ২০০২ সালে যোগ দেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ (ইউডা) ভিসি হিসেবে। এছাড়া তিনি এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের সাথেও কাজ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র কেন্দ্রিক নব্বই দশকের সর্বাপেক্ষা প্রশংসিত বাঙালি ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলনে বুদ্ধিবৃত্তিক ভূমিকা ছিল তার। গবেষণা ও লেখালেখিতে অধিকতর মনোনিবেশ করেন।
অর্ধ শতাব্দীর অধিককাল অধ্যাপনা-গবেষণায় সার্বক্ষণিক নিয়োজিত থেকে প্রফেসর এমাজউদ্দীন প্রায় ৫০টি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে তুলনামূলক রাজনীতি, প্রশাসন-ব্যবস্থা, বাংলাদেশের রাজনীতি, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক বাহিনী সম্পর্কে গবেষণা করেছেন। এসব ক্ষেত্রে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় তিনি বিশেষজ্ঞ হিসেবেও প্রখ্যাত। দেশ বিদেশের খ্যাতনামা সাময়িকীতে তার প্রকাশিত গবেষণামূলক প্রবন্ধের সংখ্যা শতাধিক। তার লিখিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: রাষ্ট্র বিজ্ঞানের কথা (১৯৬৬), মধ্যযুগের রাষ্ট্র চিন্তা (১৯৪৫), তুলানামূলক রাজনীতি: রাজনৈতিক বিশ্লেষণ (১৯৮২), বাংলাদেশে গণতন্ত্র সংকট (১৯৯২), সমাজ ও রাজনীতি (১৯৯৩), গণতন্ত্রের ভবিষৎ ( ১৯৯৪), শান্তি চুক্তি ও অন্যান্য প্রবন্ধ (১৯৯৮), আঞ্চলিক সহযোগিতা, জাতীয় নিরাপত্তা (১৯৯৯), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য প্রবন্ধ (২০০০)। এমাজউদ্দীন রচনাসমগ্র বেরিয়েছে গত বছর। আত্মজীবনী লিখছিলেন অবশেষে। এ গ্রন্থগুলোর অধিকাংশই বাংলায়। এগুলো ছিল শিক্ষার্থীদের পাঠ্যসূচির পরিপূরক। স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যয়নে তিনিই পথিকৃৎ। রাষ্ট্রবিজ্ঞান তথা সমাজ বিজ্ঞানের এমন কোনো ক্ষেত্র বা বিষয়বস্তু নেই যে বিষয়ে তিনি কলম ধরেননি। এছাড়াও ইংরেজিতে অনেক মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি।
শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান এবং সৃজনশীল লেখার জন্যে তিনি দেশ-বিদেশে সম্মানিত হয়েছেন। সৃষ্টিশীল গবেষণা ও আলেখ্য রচনার জন্য মহাকাল কৃষ্টি চিন্তা সংঘ স্বর্ণপদক, জাতীয় সাহিত্য সংসদ স্বর্ণপদক, জিয়া সাংস্কৃতিক স্বর্ণপদক অর্জন করেন। শিক্ষাক্ষেত্রে অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ১৯৯২ সালে একুশে পদক, মাইকেল মধুসুদন দত্ত স্বর্ণ পদক, শেরে বাংলা স্মৃতি স্বর্ণপদক, ঢাকা সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক স্বর্ণপদক, বাংলাদেশ যুব ফ্রন্ট স্বর্ণপদক, রাজশাহী বিভাগীয় উনয়ন ফোরাম স্বর্ণপদকসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বহু পুরস্কার-সম্মাননা অর্জন করেন। এমাজউদ্দীন আহমদ শত নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন। দেশ ও মানুষের মঙ্গল আকাক্সক্ষায় নিমগ্ন হয়েছে তার চিন্তা ও কর্মধারা। দেশপ্রেমের ফল্গুধারায় উদ্বেলিত হয়েছে তার হৃদয়। মত ও পথের ভিন্নতা আড়াল করেনি মানবিকতা ও ন্যায়ের পথ। ছিল না ভেদ-বুদ্ধির অন্ধকার। আলোকিত মানুষ ছিলেন তিনি। সবার সঙ্গে মিত্রতা, নয় কারও প্রতি শত্রুতা- এই ছিল তার কর্মধারা। রাজনৈতিক আদর্শ ও বিশ্বাসে নিরাসক্ত ছিলেন না তিনি। কিন্তু কোনো দল-মতের প্রতি ছিল না প্রশ্নহীন আনুগত্য। উন্মুক্ত ছিল হৃদয়। জাতির প্রয়োজনে উদ্যোগ ও উদ্যমে অগ্রসর হয়েছেন স্বকীয় কর্মধারায়, সংযত-সীমিত থেকেছেন নিজ পরিসরে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক হওয়ার সুবাদে গণতন্ত্র, সুশাসন, সমাজ, সংস্কৃতি ও সংকটের কথা বলেছেন। এটি কোনো দলীয় অবয়বে বিচার করা যায় না। এটি ছিল তার দেশপ্রেম, আদর্শ ও নীতিবোধের সাহসী প্রকাশ। তিনি কর্তব্যের আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন সবসময়। জ্ঞানের বাতিঘর ছিলেন তিনি। তিনি বিশ্বাস করতেন জ্ঞানই শক্তি, জ্ঞানই পুণ্য। মানুষ গড়ার প্রত্যয়ে ব্যয় করেছেন জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত। শুধু উপদেশ নয়, নিজের আচরণ দিয়ে প্রমাণ করেছেন সততা, সাহস, সংযম ও শৃঙ্খলা। সজ্জন ও সুন্দর মনের মানুষ হিসেবে পরিচিতি ছিল তার। নম্রতা, ভদ্রতা ও সৌজন্য ছিল তার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য।
মানবের তরেই বেঁচে ছিলেন তিনি। তার উদ্দেশে বলতে চাই- এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ, মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন খুবই সাদা মনের মানুষ, খুবই সাধারণ জীবনযাপন করতেন, মিষ্টভাষী ও সদালাপী ছিলেন, কখনও কাউকে হেয় করে কথা বলতেন না। আর একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হিসেবে সব সময় তিনি দেশ-জাতি ও সমাজকে নিয়ে চিন্তা করতেন। তার শেষ ইচ্ছে ছিল- দর্বৃত্তায়নের রাজনীতির চক্র থেকে মুক্ত করে দেশের গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া, রাষ্ট্রকে জনগণের মালিকানায় ফিরিয়ে দেয়া। জাতিসংঘের ৪১তম অধিবেশনে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করেন। সব মিলেই জ্ঞানে-গুণে সমৃদ্ধ এক বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী ছিলেন মানুষটি। শিক্ষার্থীদের মাঝে জ্ঞান বিতরণের পাশাপাশি দিয়েছেন অসংখ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক তত্ত্ব। দেশের রাজনৈতিক সংকট নিরসনে তিনি অনেক চেষ্টা করেন। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির রীতিতে তিনি উভয় পক্ষকে সংলাপে বসানোর চেষ্টা করেন। সংলাপে বসাতে জাতিসংঘকে চিঠিও দেন। রাজনীতি বিজ্ঞানের একজন ছাত্র হিসেবে অনার্স-মাস্টার্সে অধ্যায়নকালে আমরা তার লেখা অনেক গ্রন্থ আর তত্ত্বের সঙ্গে পরিচিত হই। দল-মত নির্বিশেষে আমার শিক্ষকরা তার প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধা রেখেই তার বিভিন্ন গ্রন্থের রেফারেন্স দিতেন। যতটুকু বুঝতে ও জানতে পেরেছি তাতে রাজনৈতিক জ্ঞানের পণ্ডিত হিসেবে দেশের মধ্যে তো বটেই, এমনকি এশিয়া মহাদেশের মধ্যে সেরাদের একজন তিনি। তার লেখা গ্রন্থ আর তত্ত্ব অধ্যয়ন না করলে কাউকে এসব কথা বলে বোঝানো মুশকিল। প্রচলিত গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় মত, চিন্তাচেতনা ও আদর্শ-বিশ্বাসের ভিন্নতা থাকবে- এটাই স্বাভাবিক। আর এটি তো গণতান্ত্রিক সমাজের অলংকারও বটে। একজন সাচ্চা দেশপ্রেমিক বলেই সবার কাছে পরিচিতি পেয়েছেন-গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পতাকাকে সমুন্নত রাখাই ছিল যার জীবনের ব্রত। তিনি ছিলেন আমাদের জাতির বুদ্ধিদীপ্ত প্রদীপগুলোর অন্যতম। সবকিছু ইতিবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার প্রচেষ্টা ছিল তার। বাংলাদেশের উন্নয়ন ও টেকসই গণতন্ত্রের জন্য তিনি আমৃত্যু কথা বলে গেছেন। তিনি নিজে একটি রাজনৈতিক মেরুতে অবস্থান করলেও অন্যান্য রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতি তার অগাধ শ্রদ্ধা ছিল। সবার চিন্তাধারা, যুক্তি নিয়ে সমন্বয় করে সামগ্রিক উন্নয়নের প্রয়াস ছিল তার মধ্যে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান সম্পর্কিত তার অনেক বই বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলাদেশের পাঠ্যসূচীতেও অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। ২০২০ সালের ১৭ জুলাই মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে ঢাকার ল্যাব এইড হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। স্যারের বিদায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অপূরণীয় ক্ষতি। বাংলাদেশ হারালো উপমহাদেশের একজন শ্রেষ্ঠ রাজনীতি বিজ্ঞানীকে।

নজরুল ইসলাম ভুঁইয়া

রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়

print